Tue 8th Sep 2026, 4:51 pm

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বর্ণ রিজার্ভ: ১৪ হাজার কেজি সোনা, অবস্থান এবং কৌশলগত ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বর্ণ রিজার্ভ: ১৪ হাজার কেজি সোনা, অবস্থান এবং কৌশলগত ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার ২৭৮ কিলোগ্রাম স্বর্ণ মজুত রয়েছে, যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য ১৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। এই বিশাল স্বর্ণ ভান্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে সংরক্ষিত আছে। অবশিষ্ট স্বর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যাংকসমূহ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণে কোনো পরিবর্তন আসেনি; মোট ৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৩.৫২ ট্রয় আউন্স স্বর্ণ মজুত রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির ফলস্বরূপ, এর আর্থিক মূল্যমান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই স্বর্ণের মোট আর্থিক মূল্য ছিল ১১ হাজার ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা গত অর্থবছর শেষে প্রায় ২ হাজার ৪২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা বেড়ে ১৩ হাজার ৪৩৬ কোটি ৬২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ, রৌপ্য ও প্লাটিনামের মতো মূল্যবান ধাতু সাধারণত ট্রয় আউন্সে পরিমাপ করা হয়, যেখানে এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১.১০৩৫ গ্রাম। সাধারণ আউন্সের (২৮.৩৫ গ্রাম) সাথে এর পার্থক্য রয়েছে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওজনে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত ভরি বা তোলা ব্যবহার করা হয়, যেখানে ১ ভরি = ১১.৬৬ গ্রাম। এই হিসাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় ১৪ হাজার ২৮২ কেজি (১৪.২৮ টন) বা ১২ লাখ ২৪ হাজার ৫৮৮ ভরি স্বর্ণ মজুত আছে।

ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির প্রভাবে গত দুই বছরে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গোল্ডপ্রাইজ ডট অর্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ৩ হাজার ২৯৭ মার্কিন ডলার, যা চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারিতে ৫ হাজার ৬০০ ডলারে উন্নীত হয়। পরবর্তীতে কিছুটা কমে গত ৩০ জুন প্রতি আউন্স স্বর্ণ ৪ হাজার ২৪ ডলারে এবং সর্বশেষ গত রোববার ৪ হাজার ৪৩০ ডলারে বিক্রি হয়েছে।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশেও স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রেখেছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ টাকা অতিক্রম করে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ২৩৬ টাকা, যা চলতি বছরের জুনে বেড়ে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকায় পৌঁছেছে। সর্বশেষ গত রোববার ভালো মানের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

দেশের স্বর্ণ কোথায় জমা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মজুত স্বর্ণ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে জমা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক, প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯২৭ ট্রয় আউন্স স্বর্ণ যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে জমা আছে। এই স্বর্ণ লেন্ডিং বা ঋণ কার্যক্রমে নিয়োজিত, যার অর্থ হলো বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে কেবল ভল্টে ফেলে না রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণ হিসেবে প্রদান করে সুদ বা ফি অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে, প্রায় ৮৩ হাজার ৯৬১ ট্রয় আউন্স স্বর্ণ সরাসরি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে। অবশিষ্ট স্বর্ণ যুক্তরাজ্যভিত্তিক দুটি প্রধান আন্তর্জাতিক ব্যাংক—লন্ডনের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এবং এইচএসবিসিতে আমানত বা বিনিয়োগ হিসেবে রাখা হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ৯২ হাজার ৭৩৯ ট্রয় আউন্স স্বর্ণ এবং এইচএসবিসিতে ৯৩ হাজার ৫৩৫ ট্রয় আউন্স স্বর্ণ জমা রাখা হয়েছে।

স্বর্ণের পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭২৮ ট্রয় আউন্স রৌপ্য মজুত রয়েছে। গত এক বছরে রৌপ্যের পরিমাণে কোনো পরিবর্তন না এলেও, দাম বৃদ্ধির কারণে এর বাজারমূল্য ৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে এর দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই ইতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থমূল্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, 'কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কীভাবে রিজার্ভ রাখা হচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশীয় ও বৈদেশিক ব্যাংকে রিজার্ভ হিসেবে যে সোনা রেখেছে, তা সুবিবেচনা থেকেই করেছে। কারণ, সোনা সব সময়ই একটি ভালো জামানত ও নিরাপদ বিনিয়োগ। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোনার রিজার্ভ থাকাটা একটি ইতিবাচক ও লাভজনক বিনিয়োগ।'