Fri 17th Jul 2026, 2:58 am

উৎসবে পরার গয়না ২০০-৬০০ টাকায়: উত্তরা রাজলক্ষ্মীর ফুটপাত বাজারের আকর্ষণ

উৎসবে পরার গয়না ২০০-৬০০ টাকায়: উত্তরা রাজলক্ষ্মীর ফুটপাত বাজারের আকর্ষণ
প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ এই জনাকীর্ণ পরিসরে দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে স্থাপিত হয়েছে অসংখ্য ছোট দোকান। এই দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে হরেক রকম গয়না, যার মাঝখানে রয়েছে সংকীর্ণ একটি পথ। এই পথ ধরেই ক্রেতারা মন্থর গতিতে হেঁটে চলেছেন, থেমে থেমে পণ্য দেখছেন, পছন্দ হলে কিছু সংগ্রহ করছেন, এবং পুনরায় সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
এই বর্ণনা উত্তরা রাজলক্ষ্মী মার্কেটের পাশ্ববর্তী ফুটপাত জুড়ে গড়ে ওঠা গয়নার বাজারকে কেন্দ্র করে। এর মূল আকর্ষণ হলো সাশ্রয়ী মূল্যে বিচিত্র সব গয়না প্রাপ্তি, যা এই স্থানকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এনে দিয়েছে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এই অস্থায়ী বাজারটি ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত থাকে।
প্রতিটি দোকানের সামনে শোভা পাচ্ছে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় কানের দুল। এর মধ্যে রয়েছে অক্সিডাইজড রূপার বড় ঝুমকা, সূক্ষ্ম স্টাড, মুক্তা খচিত ড্রপ ইয়াররিং এবং জ্যামিতিক নকশার মেটাল দুল। এছাড়া, রঙিন পুঁতির মালা, টেরাকোটা পেনড্যান্ট এবং সাদা পাথরের তৈরি চোকারও এখানে সুলভ। ধাতব চুড়ির পাশাপাশি রয়েছে রেজিনের মোটা বালা, কাপড় মোড়ানো চুড়ি এবং হরেক রকম আংটির সমাহার।
এখানে পণ্যের মূল্য ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকে। মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় অনুষ্ঠান বা দাওয়াতে পরিধানের উপযোগী পূর্ণাঙ্গ গয়নার সেট পাওয়া যায়। রূপা ও অক্সিডাইজ ফিনিশিংয়ে তৈরি এসব গয়নায় মিনাকারি, পাথর ও কৃত্রিম মুক্তার সূক্ষ্ম কারুকার্য লক্ষ্য করা যায়।
বিভিন্ন ডিজাইনের মালা ২০০ থেকে ৬০০ টাকায় পাওয়া যায়, যা শাড়ি বা পাশ্চাত্য পোশাক উভয় সঙ্গেই অনায়াসে মানিয়ে যায়। কানের দুলের ক্ষেত্রে, ছোট টপ থেকে শুরু করে বড় ঝুমকা পর্যন্ত সকল প্রকারের দুলই সুলভ, যার মূল্য ৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
হালকা নকশার দুলের পাশাপাশি রয়েছে বড় পাথরের দৃষ্টিনন্দন স্টেটমেন্ট দুল, যেগুলিতে একাধিক রঙের পাথরের চমৎকার ব্যবহার দেখা যায়। আংটির মূল্য ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে এবং ব্রেসলেট ১৫০ থেকে ৪০০ টাকায় সংগ্রহ করা যায়।
চুড়ির ক্ষেত্রেও ব্যাপক বৈচিত্র্য বিদ্যমান। কাচ, মেটাল এবং অ্যান্টিক নকশার চুড়ি ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় মেলে। এক ডজন কাশ্মীরি চুড়ির মূল্য ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, এবং এর সাথে ঘুঙুর যোগ করতে অতিরিক্ত প্রায় ১৫০ টাকা ব্যয় করতে হয়।
দোকানগুলি একে অপরের কাছাকাছি হওয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। অনেক ক্রেতাই একবারে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত না নিয়ে একাধিক দোকান ঘুরে দেখেন, পণ্যের তুলনামূলক মান ও মূল্য যাচাই করেন, অতঃপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
কেউ কানে দুল ধরে আয়নায় সেটির মানানসইতা পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ শাড়ির সাথে এর সামঞ্জস্য নিয়ে ভাবছেন। বিক্রেতারাও অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে একের পর এক পণ্য প্রদর্শন করছেন। মাঝে মাঝে তারা নতুন ডিজাইন উপস্থাপন করে বলছেন, ‘এটি এখন খুব জনপ্রিয়।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী মিথিলা তার বন্ধুর সাথে এসেছেন। হাতে কয়েকটি দুলের জোড়া নিয়ে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘একই স্থানে এত বিকল্প থাকায় আমি প্রথমে সব দেখে নিচ্ছি। আগে পছন্দ হলেই কিনে ফেলতাম, কিন্তু এখন একটু মিলিয়ে দেখি।’
তাঁর বন্ধু আদৃতা যোগ করে বললেন, ‘অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, প্রথম দোকানির চাওয়া মূল্যের অর্ধেক দামে গয়না কিনেছি। তাই গয়না কেনার আগে দরদাম করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, একই পণ্য আরও কম মূল্যে সংগ্রহ করা সম্ভব।’
বিক্রেতাদের কথায়ও একই প্রতিধ্বনি শোনা গেল। গত বছর থেকে এখানে দোকান পরিচালনা করছেন রাকিব হাসান। তিনি জানান, ‘ভিড় থাকলেও ক্রেতারা আগের মতো হুট করে পণ্য কেনেন না। অধিকাংশ ক্রেতাই প্রথমে ঘুরে দেখেন, তারপর পুনরায় ফিরে এসে ক্রয় করেন।’
এই বাজারের ক্রেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণীরা। আধুনিক নকশা এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্য — এই দুটি কারণই তাদের অধিক আগ্রহের মূলে। অনেকেই দুল, হার এবং বালা সমন্বয়ে গঠিত সম্পূর্ণ সেট হিসেবে গয়না ক্রয় করছেন।
আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র বাজারে নতুন কী এসেছে, তা দেখতে আসেন। স্থান সংকীর্ণ হওয়ায় দুপুরের পর থেকে ভিড় কিছুটা বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবুও সেই ভিড়ের মাঝেই চলে নিজেদের পছন্দসই পণ্য বাছাই, দরদাম এবং আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি খুঁজে বের করার নিরন্তর প্রচেষ্টা।