Sat 19th Sep 2026, 8:59 pm

পিতা আমার অনুপ্রেরণার উৎস, মাতা দেখান নতুন স্বপ্নের পথ: কৃতী শিক্ষার্থীর অনুভূতি

পিতা আমার অনুপ্রেরণার উৎস, মাতা দেখান নতুন স্বপ্নের পথ: কৃতী শিক্ষার্থীর অনুভূতি
“ষাট কিলোমিটারের সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছি। আজ আমার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূর্ণতা পেল। এই মুহূর্তে আমার মানসপটে মা-বাবার মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে; এই সাফল্যের পেছনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। পিতা প্রতিদিন আমাকে অনুপ্রেরণা দেন; তিনিই আমার প্রেরণার উৎস। মা প্রতিনিয়ত নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে দেন। এই সামান্য প্রাপ্তিতে এত বিশাল সম্মান পেয়ে আমি অভিভূত। দেশি মিডিয়া পয়েন্ট এবং শিখো-কে অসংখ্য ধন্যবাদ।”

এইভাবেই নিজের আবেগ প্রকাশ করেন নাদিয়া বেগম, আজ শনিবার সুনামগঞ্জে আয়োজিত ‘শিখো-দেশি মিডিয়া পয়েন্ট জিপিএ-৫ কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২০২৬’ অনুষ্ঠানে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। নাদিয়া বেগম জেলার ছাতক উপজেলা থেকে এসেছিলেন; তিনি ছাতকের মঈনপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে চলতি বছর জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।

‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ এই প্রেরণাদায়ী স্লোগানকে সামনে রেখে, দেশি মিডিয়া পয়েন্টের আয়োজনে এবং ডিজিটাল শিক্ষামঞ্চ ‘শিখো’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশের ৬৪টি জেলায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আজ সুনামগঞ্জ পর্বের এই বিশেষ আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

এবারের আয়োজনটি ‘বিকাশ’ এর সৌজন্যে (powered by) অনুষ্ঠিত হয়। এর সহযোগিতায় ছিল কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, স্যাভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা এবং দেশি মিডিয়া পয়েন্ট বন্ধুসভা।

আজ সকালের আবহাওয়া ছিল ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল। যদিও এক পর্যায়ে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হতে থাকে, তবু এর মাঝেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীরা সমবেত হতে শুরু করে। অনেক শিক্ষার্থীর সাথে তাদের অভিভাবকেরাও উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পদচারণায় মিলনায়তন প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হয়ে ক্রেস্ট, স্ন্যাকস ও উপহারসামগ্রী গ্রহণ করে। দেশি মিডিয়া পয়েন্ট এর এক্সপেরিয়েন্স জোনে বিভিন্ন বিনোদনমূলক খেলায় অংশ নিয়ে কেউ কেউ পুরস্কারও জিতে নেয়। অনেকে প্রিয়জন ও বন্ধুদের সাথে স্মৃতি ধরে রাখতে ফটো বুথে ভিড় করে।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। বন্ধুসভার সদস্যবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। আলোচনা পর্বে, অতিথিবৃন্দ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহাদত হোসেন, সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে আজাদ এবং সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি কানিজ সুলতানা।

সুনামগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি সৌরভ সরকারের সঞ্চালনায়, সুনামগঞ্জে দেশি মিডিয়া পয়েন্টের নিজস্ব প্রতিবেদক খলিল রহমান স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। বন্ধুসভার উপদেষ্টা মোহাম্মদ রাজু আহমেদ শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থ বিদ্যাকে ‘না’ বলার শপথ বাক্য পাঠ করান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সিলেটের দেশি মিডিয়া পয়েন্টের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ এবং বন্ধুসভার উপদেষ্টা দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন নাদিয়া বেগম ও তাসনিম সরকার ইমামিম।

অধ্যক্ষ শাহাদত হোসেন তাঁর বক্তব্যে বলেন, জিপিএ-৫ অর্জন চূড়ান্ত সফলতা নয়; প্রকৃত সফলতা নিহিত মানবিক ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার মধ্যে। দেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক মনস্ক মানুষ হওয়া আবশ্যক। জীবনে পরম সাফল্যের জন্য নিরলস পরিশ্রম অপরিহার্য; কারণ পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি।

কানিজ সুলতানা গুরুত্বারোপ করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। একজন ভালো বন্ধু সৎ কাজে সহযোগিতা করে, পক্ষান্তরে মন্দ সঙ্গ অনেক সময় জীবনকে হতাশা ও বিনাশের পথে ঠেলে দেয়। সুতরাং, সর্বদাই সদ্গুণ ও সৎসঙ্গের অনুসারী হওয়া উচিত।

সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে আজাদ শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের কাছে প্রতিটি শিক্ষার্থীই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সর্বদা পর্যবেক্ষণ করব তোমাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে কিনা। এই তিনটি গুণই তোমাদের সম্মুখে অগ্রসর হতে সাহায্য করবে। দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা সর্বদা স্মরণে রাখতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার পেছনে সাধারণ মানুষের শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে।”

সাংবাদিক সুমনকুমার দাশ তাঁর বক্তব্য শুরু করেন সুনামগঞ্জের ৭১ বছর বয়সী সহজ-সরল লস্কর আলীর দৃষ্টান্তমূলক গল্প দিয়ে। নিরক্ষর এই মানুষটি বিগত ৪৫ বছর ধরে ঘোড়ার ঘানিতে খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন করে আসছেন। তাঁর দৃঢ় সংকল্প ছিল তিনি কখনো তেলে ভেজাল মেশাবেন না।

সুমনকুমার দাশ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আজ যাদের আমরা সংবর্ধনা প্রদান করছি, তারা প্রত্যেকেই সততা ও দক্ষতার মাধ্যমে সফল মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দেশি মিডিয়া পয়েন্ট সর্বদা তোমাদের পাশে থাকবে।”

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে অনলাইন কুইজে বিজয়ী ১০ জন শিক্ষার্থীকে বই উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। বন্ধুসভার সদস্যবৃন্দ, সংবর্ধিত শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং স্থানীয় নৃত্যম নৃত্যালয় ও স্পন্দনের শিল্পীবৃন্দ মনোজ্ঞ গান ও নৃত্য পরিবেশন করে অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।