Thu 1st Oct 2026, 4:32 am

উচ্চ ভোগব্যয় ও জাতীয় সঞ্চয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা: অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় নতুন চ্যালেঞ্জ

উচ্চ ভোগব্যয় ও জাতীয় সঞ্চয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা: অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় নতুন চ্যালেঞ্জ
দেশের অর্থনীতির সম্প্রসারণ সত্ত্বেও, চলতি মূল্যে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে এই সঞ্চয়ের হার অনুপাতিকভাবে বৃদ্ধি পায়নি, বরং ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিগত তিন অর্থবছর ধরে জিডিপির তুলনায় জাতীয় সঞ্চয়ের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর অর্থ হলো, অর্থনৈতিক পরিধি বাড়লেও সঞ্চয়ের হার সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপিতে বিনিয়োগের হারও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার বিপরীতে ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯.৯৫ শতাংশ। কিন্তু সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে এই হার কমে ২৬.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তিন অর্থবছরের ব্যবধানে প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্টের পতন নির্দেশ করে। একইভাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশজ সঞ্চয়ের হার ছিল ২৫.৭৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১.৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এই তিন বছরের ব্যবধানে দেশজ সঞ্চয় হ্রাস পেয়েছে ৪.৩৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মন্তব্য করেছেন, "দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলস্বরূপ, আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।"

অর্থনীতিবিদগণ সতর্ক করে বলেছেন যে, জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়া মানে হলো বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের হ্রাস। বিনিয়োগের এই নিম্নগতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জন আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তদুপরি, জাতীয় সঞ্চয় হ্রাস পেলে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই, অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির বিপরীতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের একটি তুলনামূলক উচ্চ হার বজায় রাখা অপরিহার্য। তবে গত কয়েক বছরে এই খাতে একটি নেতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আরও উল্লেখ করেছেন যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে খরচের চাপ বাড়িয়েছে, যা আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয় সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, প্রবাসী আয়ের শ্লথ গতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকসানও জাতীয় সঞ্চয় হ্রাসের অন্যতম কারণ।

প্রসঙ্গতঃ, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে পণ্য ও সেবা খাত থেকে অর্জিত মোট আয় থেকে জনগণ ও সরকারের মোট ভোগ ব্যয় বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে দেশজ সঞ্চয় বলা হয়। অন্যদিকে, দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রাপ্ত আয় যোগ করে জাতীয় সঞ্চয় পরিমাপ করা হয়।

মূলত, কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কাল অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছর থেকেই সঞ্চয়ের হারে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়। যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছরে সঞ্চয়ের হারে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, এর পরবর্তী তিন অর্থবছর ধরে তা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। করোনা পূর্ববর্তী ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে দেশজ সঞ্চয়ের হার ছিল ২৭ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ৩১.৪২ শতাংশ। সর্বশেষ গত অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, জিডিপির তুলনায় দেশজ সঞ্চয়ের হার হ্রাস পেয়ে ২১ শতাংশে এবং জাতীয় সঞ্চয়ের হার প্রায় ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

যদিও চলতি মূল্যে সঞ্চয়ের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবিএসের তথ্যানুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জাতীয় সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদগণ অর্থনীতির প্রকৃত সঞ্চয় প্রবণতা এবং মূলধন গঠনের সক্ষমতা মূল্যায়নে জিডিপির অনুপাতকে অধিক গুরুত্ব দেন। এর কারণ হলো, চলতি মূল্যে টাকার অঙ্কে সঞ্চয়ের বৃদ্ধি সর্বদা মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিচায়ক নাও হতে পারে। জিডিপির অনুপাত গণনার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনীতির আকারের সাপেক্ষে সঞ্চয় ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল, তা সুস্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেছেন, জাতীয় সঞ্চয় হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ ভোগ ব্যয়ে (পণ্য ও সেবার জন্য ব্যয়) চলে যাচ্ছে, যা জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর পর সঞ্চয়ের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে।

বিবিএসের প্রতিবেদন অনুসারে, বিগত তিন অর্থবছরে জিডিপিতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪.২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮.৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বিগত কয়েক বছর ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান সহ অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশেও টানা চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় রয়েছে। সর্বশেষ আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি ১০ শতাংশের উপরে ছিল।

বিবিএসের তথ্যে আরও দেখা যায় যে, ছয় বছর পূর্বে জিডিপিতে মোট বিনিয়োগের হার ৩১ শতাংশের বেশি থাকলেও বর্তমানে তা ২৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এই সময়ে বেসরকারি ও সরকারি উভয় খাতেই বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে।

র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক ব্যাখ্যা করেছেন যে, জাতীয় সঞ্চয়ের হ্রাস বিনিয়োগকেও সংকুচিত করে। সঞ্চয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিলে টান পড়ে, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সঞ্চয়-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ার অর্থ হলো, দেশের অভ্যন্তরীণভাবে সংগৃহীত মূলধন দিয়ে নিজস্ব বিনিয়োগের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ সচল রাখতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা ঋণ প্রাপ্তি, ব্যবস্থাপনা এবং পরিশোধের চাপকে বাড়িয়ে তোলে।

বর্তমান সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি ফিরিয়ে আনতে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ, এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান হ্রাস করা। তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করার প্রচেষ্টা চালানোও অত্যাবশ্যক।