Sun 25th Oct 2026, 2:29 pm
|

সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে নবদম্পতির মনোমালিন্য: চরকির 'হ্যাপিলি ম্যারিড'-এর পর্যালোচনা

সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে নবদম্পতির মনোমালিন্য: চরকির 'হ্যাপিলি ম্যারিড'-এর পর্যালোচনা
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মানব সম্পর্কে চিড় ধরছে কিনা, সেই প্রশ্নটিই যেন চরকির নতুন ওয়েব সিনেমা 'হ্যাপিলি ম্যারিড'-এর মূল উপজীব্য। প্ল্যাটফর্মটির 'মিনিস্ট্রি অব লাভ' প্রকল্পের অধীনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন জাহিদ প্রীতম। এতে প্রথমবারের মতো জুটি হিসেবে দেখা গেছে জনপ্রিয় অভিনেতা আরিফিন শুভ এবং কেয়া পায়েলকে। তবে কেমন কাটল তাদের দাম্পত্য জীবনের পথচলা, সেটাই এখন দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।

কী আছে এর গল্পে
চলচ্চিত্রের মূল কাহিনীতে, আনিস (আরিফিন শুভ) একজন ৩৫ বছর বয়সী বিদ্যুৎ প্রকৌশলী, যিনি বিবাহে অনিচ্ছুক। তার জন্য পাত্রী দেখার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, একদিন এক কৌশলী বাবা (সালাহউদ্দিন লাভলু) তার মেয়ে অনামিকাকে (কেয়া পায়েল) আনিসের সামনে আনেন। হবু শ্বশুরের এই সুক্ষ্ম পরিকল্পনা আনিসের বোধগম্য না হলেও, অনামিকাকে তার পছন্দ হয়। যদিও দুজনের মধ্যে বয়সের বেশ ফারাক এবং তারা ভিন্ন প্রজন্মের প্রতিনিধি, তবুও প্রাথমিক পর্যায়ে এটি তাদের সম্পর্কের পথে অন্তরায় হয় না। ফলস্বরূপ তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তবে এটিকে 'হ্যাপিলি ম্যারিড' ভাবলে ভুল হবে, কারণ এটি গল্পের মাত্র সূচনা।

নবদম্পতির জটিলতা বৃদ্ধি পায় তাদের বিবাহের প্রথম দিন থেকেই। বাসরঘরে অনামিকা বিষণ্ণ বদনে বসে থাকে, কারণ তার সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ মনস্তত্ত্ব স্বামীর পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। সে রাতেই স্বামীকে সরাসরি জানিয়ে দেয়, 'এটা কেমন বিয়ে হলো?' তার স্বপ্ন ছিল, এক রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে এসে তাকে নিয়ে যাবে, যা সকলের কাছে এক বিস্ময় হয়ে থাকবে। অনামিকা আশা করেছিল, বিয়ের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে অসংখ্য লাইক ও মন্তব্য পাবে। কিন্তু বাস্তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার মতো কোনো ছবিই তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিল না। আনিস উপলব্ধি করে যে স্ত্রীর ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের প্রতি আসক্তি তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়েও বেশি। তবুও সে প্রাথমিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের মধ্যে মানসিক সংঘাত ও মতপার্থক্য বাসরঘর থেকেই শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটেই সিনেমার গল্প এগিয়ে চলে। চলচ্চিত্রটির গল্পের সঙ্গে বর্তমান সমাজের এক গভীর যোগসূত্র বিদ্যমান, তাই হয়তো প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানে আরিফিন শুভ মন্তব্য করেছিলেন, 'যারা এখনো বিয়ে করেননি, তাদের এই সিনেমা দেখে বিয়ে করতে ইচ্ছা করবে। বিবাহিত-অবিবাহিত নির্বিশেষে সকলকে এই সিনেমা গভীরভাবে ভাবাবে।'

জটিল সম্পর্কে তৃতীয়জন
যদিও 'হ্যাপিলি ম্যারিড' নামটি মধুরতার ইঙ্গিত দেয়, বাস্তবতার কষ্টিপাথরে একটি দম্পতির জীবন কি সর্বদা এতটাই মসৃণ ও আনন্দময় হয়? আনিস ও অনামিকার সম্পর্কের এই দ্বিধা ও সংঘাতের অনুসন্ধান করতে গিয়ে চলচ্চিত্রের গল্পে আধুনিক জীবনের জটিলতা, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাবগুলি স্তর থেকে স্তরে উন্মোচিত হয়। প্রযুক্তি কীভাবে সম্পর্কে ব্যবধান তৈরি করে, তা এই ওয়েব ফিল্মে সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত হয়েছে। নির্মাতা দক্ষতার সঙ্গে দুই প্রজন্মের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির পার্থক্য তুলে ধরেছেন। যেখানে একজনের কাছে জীবন মানে আপস, অন্যের কাছে তা নিজের সমস্ত ইচ্ছা পূরণ। এই ইচ্ছাশক্তি থেকেই অনামিকা স্বামীকে তার কাছে আসতে বাধা দেয় এবং একটি কঠোর শর্ত আরোপ করে: মানসিকভাবে একাত্ম না হলে শারীরিক দূরত্বও বজায় রাখতে হবে। আনিস কি এই শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হবে? তাদের সংসারে সন্দেহ দানা বাঁধে। এ সময় গল্পে প্রবেশ করেন একজন আলোচিত সেলিব্রিটি, আরেফিন জিলানী, যার বড় ভক্ত অনামিকা। প্রিয় তারকার সঙ্গে কি অনামিকা কোনো প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়েছে? সময়ের সাথে এই প্রশ্ন আরও গভীর হতে থাকে।

অভিনয় ও রসায়ন
এই চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো কেন্দ্রীয় চরিত্র দুটির অসাধারণ অভিনয়। চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ তার সহজাত অভিনয় নৈপুণ্যে আনিস চরিত্রটিকে নিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। একজন সহজ-সরল যুবক, যার জীবনে বিবাহপূর্ব সময়ে অফিস ও রান্না ছাড়া অন্য কোনো আকর্ষণ ছিল না। বাড়িতে আনিসের আটপৌরে জীবনযাপন কিংবা অফিসে একজন কর্মী হিসেবে তার চরিত্রায়ণ ছিল অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। এছাড়াও, সাধারণ রান্না করা এবং স্ত্রীর মন জয় করার জন্য তার ব্যাকুলতা দেখে তাকে পাশের বাড়ির পরিচিত একজন মনে হয়। অনামিকার সঙ্গে তার রোমান্টিক দৃশ্যগুলোও দর্শককে মুগ্ধ করবে। কেয়া পায়েলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-আসক্ত তরুণী অনামিকার চরিত্রে চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছেন। কখনো ক্রুদ্ধ, কখনো জীবন সম্পর্কে অত্যন্ত হিসেবী, আবার কখনো স্বামীর প্রতি কিছুটা মনোযোগী রূপে তাকে দেখা যায়। অনামিকা খাদ্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন; স্বামীর রান্না করা প্রতিটি খাবারের ক্যালরি তিনি মুখস্থ বলতে পারেন। স্বামীর সাধারণ জীবনযাপন একপর্যায়ে সে গোপনেই পছন্দ করতে শুরু করে। এই সম্পর্কের রসায়ন দর্শকদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করবে। পর্দায় তাদের মধ্যকার টানাপোড়েনও বাস্তবসম্মত ও হৃদয়গ্রাহী মনে হয়েছে।

নজড় কেড়েছে পার্শ্বচরিত্র
পার্শ্বচরিত্রের মধ্যে সালাহউদ্দিন লাভলুর শৌখিন গোয়েন্দা চরিত্রটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। যদিও একপর্যায়ে তার উপস্থিতি গল্পের ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তথাপি চরিত্রটি যদি আরও বিস্তৃত করা যেত এবং শেষ পর্যন্ত তার গোয়েন্দাগিরি অব্যাহত থাকত, তাহলে তা গল্পের জন্য অধিকতর উপযোগী হতো। সামগ্রিকভাবে তার চরিত্রায়ণ ছিল যথাযথ। পারিবারিক নাটকের ক্ষেত্রে দীপা খন্দকার ও তুষার খানের অভিনয় ছিল বাড়তি পাওয়া, যা দর্শকদের আনন্দ জুগিয়েছে। গল্পের প্রয়োজনে তাদের চরিত্রগুলোর আগমনও ছিল প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর। শিশুশিল্পী রাই রাজন্যও তার অভিনয়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছে।

নির্মাণশৈলী, চিত্রনাট্য, আবহ সংগীত ও সিনেমাটোগ্রাফি
পরিচালক জাহিদ প্রীতম এই রোমান্টিক গল্পে দৃশ্যের নান্দনিক উপস্থাপনে তার মুনশিয়ানা প্রদর্শন করেছেন। তিনি দুটি ভিন্ন প্রজন্মের জীবনযাপনকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন এবং সম্পর্কের অন্তর্নিহিত হাহাকারকে খুব কাছ থেকে মর্মস্পর্শী রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। হালকা অথচ গভীর ভঙ্গিমায় তিনি এই বিষয়গুলি উপস্থাপন করেছেন। চিত্রনাট্যের সাথে চলচ্চিত্রের আবহ সঙ্গীত ছিল সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। সিনেমাটোগ্রাফার শহুরে যান্ত্রিকতা এবং মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের অভ্যন্তরের উষ্ণ পরিবেশ—উভয়কেই চমৎকারভাবে ক্যামেরাবন্দী করতে সক্ষম হয়েছেন।

কতটা জমল
তবে 'হ্যাপিলি ম্যারিড' চলচ্চিত্রের গল্পটি অনেকাংশেই অনুমানযোগ্য। চিত্রনাট্যের এই দিকটিতে আরও গভীর মনোযোগের প্রয়োজন ছিল, কারণ কাহিনীতে নতুনত্বের অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং তা একই সরল রেখায় প্রবাহিত হতে থাকে। এছাড়া, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘক্ষণ ধরে উপস্থাপিত হওয়ায় গল্পের গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে; এই অংশটির দৈর্ঘ্য হ্রাস করলে কাহিনী আরও সুসংবদ্ধ হতে পারত। বিয়ের পূর্বে আনিস ও অনামিকার প্রথম সাক্ষাতের কথোপকথন অনামিকার পরিপক্কতাকে স্মরণ করিয়ে দিলেও, বিয়ের পর তার আচরণে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। গল্পে মায়ের সাথে তরুণ আনিসের ভিডিও দৃশ্যটি আরও আবেগিক গভীরতা যোগ করতে পারত। আরেফিন জিলানীকে একজন সেলিব্রিটি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, তার চরিত্রায়ন আরও জমকালো হতে পারত। তার সাথে চ্যাটকে ঘিরে যে সন্দেহ তৈরি হয়, তা পরবর্তীতে ভিন্নভাবে দেখানো হয়েছে। কেবল নাটকীয়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সংযোজিত দৃশ্যগুলিতে আরও যত্নশীল হওয়া উচিত ছিল, কারণ প্রেম ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্বতন্ত্র। এতদসত্ত্বেও, হালকা মেজাজের রোমান্টিক-কমেডি-ড্রামা ঘরানার এই চলচ্চিত্রটি সামগ্রিকভাবে উপভোগ্য।