Mon 26th Oct 2026, 2:42 pm
|

এআইয়ের যুগে সফটওয়্যার মান: বাংলাদেশের জন্য এক নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা

এআইয়ের যুগে সফটওয়্যার মান: বাংলাদেশের জন্য এক নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ঘিরে দীর্ঘকাল ধরেই সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন লালিত হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর তথ্যপ্রযুক্তিই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হবে—এই প্রত্যাশায় একসময় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল।

তবে বর্তমান বাস্তবতা সেই লক্ষ্য থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার।

এর প্রায় ৮৭ শতাংশই এসেছে কম্পিউটার সেবা থেকে, যেখানে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, আউটসোর্সিং এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত; এটি ৫০০ কোটি ডলারের বিশাল লক্ষ্যের তুলনায় সরকারি হিসাবে মাত্র ১৪.৫ শতাংশ অর্জন নির্দেশ করে।

যদিও রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে ভিন্নমত বিদ্যমান এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত আয় অনেক সময় সরকারি হিসাবে সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত হয় না, তবুও লক্ষ্য ও বাস্তবতার বিশাল ব্যবধান অনস্বীকার্য। এই ব্যবধানকে কেবল একটি ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখলে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করব।

বরং এই মুহূর্তে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ ঠিক কোন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে? আমার মতে, এর একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উত্তর হলো সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স (QA) ও টেস্টিং।

বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে কেবল কোড লিখলেই সাফল্য আসে না।

আন্তর্জাতিক গ্রাহকরা কেবল কম খরচে সফটওয়্যার তৈরির দেশ খোঁজেন না; তারা এমন অংশীদার চান যারা নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ, স্কেলেবল এবং ধারাবাহিকভাবে মানসম্পন্ন সফটওয়্যার সরবরাহ করতে সক্ষম। দ্রুত সফটওয়্যার তৈরি করা গেলেও সেটির সঠিক কার্যকারিতা, লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারীর চাপ সামলানোর ক্ষমতা, তথ্য নিরাপত্তা এবং নতুন আপডেটের পর পুরনো ফিচারের অক্ষুণ্ণ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে।

বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসার অন্যতম বৃহৎ সম্পদ হলো আস্থা, আর সেই আস্থার মূল ভিত্তি হলো পণ্যের মান বা কোয়ালিটি।

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ে আলোচনার সময় আমরা প্রায়শই ডেভেলপার, ফ্রিল্যান্সার, আউটসোর্সিং কিংবা বিজনেস প্রসেস সেবার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। তবে সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্সকে এখনো একটি স্বতন্ত্র ও উচ্চমূল্যের রপ্তানি সক্ষমতা হিসেবে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এখন এসেছে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে ফাংশনাল টেস্টিং, টেস্ট অটোমেশন, পারফরম্যান্স টেস্টিং, সিকিউরিটি টেস্টিং, এপিআই টেস্টিং, মোবাইল টেস্টিং, ডেটা কোয়ালিটি, কনটিনিউয়াস টেস্টিং, এআই টেস্টিং এবং টেস্টিং-অ্যাজ-আ-সার্ভিস প্রতিটিই স্বতন্ত্র ও উচ্চমূল্যের পেশাগত সেবা। বাংলাদেশ কেবল বিদেশি গ্রাহকদের জন্য সফটওয়্যার তৈরিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদের দক্ষ দল দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারের কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স, টেস্ট অটোমেশন, পারফরম্যান্স, সিকিউরিটি এবং পূর্ণাঙ্গ কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিং সেবা প্রদান করতে পারে।

এই ধরনের কাজের একটি বড় সুবিধা হলো, এগুলো দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে রিমোটলি সম্পন্ন করা যায়। একজন দক্ষ টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা সিলেটে বসেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ সফটওয়্যার প্রকল্পে কাজ করতে পারেন।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য নতুন ও বিশাল রপ্তানি আয়ের সুযোগ নিহিত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফটওয়্যার তৈরির গতিকে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে এআই কোড লেখা, টেস্ট কেস তৈরি, ত্রুটি শনাক্তকরণ, ডকুমেন্টেশন তৈরি এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের বহু কাজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করছে।

তবে এর ফলে একটি নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে: সফটওয়্যার তৈরির গতি যত বৃদ্ধি পাবে, তার মান যাচাইয়ের গুরুত্বও আনুপাতিক হারে বাড়বে। শুধু সফটওয়্যার পরীক্ষা করলেই চলবে না, এখন এআইকেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে।

তবে এআই সফটওয়্যার টেস্টারের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করবে এমন সরল ধারণা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত নয়। বরং এআই টেস্টারের কাজের ধরনকে রূপান্তরিত করবে এবং তাদের দক্ষতার মানকে বহুগুণে উন্নত করবে।

ভবিষ্যতের কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারকে টেস্ট অটোমেশন, ডেটা, এআই, সিকিউরিটি, পারফরম্যান্স এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সমন্বিত ও গভীর ধারণা রাখতে হবে।

বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ড (বিএসটিবি) প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে সফটওয়্যারের গুণগত মানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। বিএসটিবি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ডের বাংলাদেশে অনুমোদিত জাতীয় পর্ষদ হিসেবে দেশের পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টেস্টিং সার্টিফিকেশন ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করছে।

বর্তমানে সংস্থাটি ফাউন্ডেশন থেকে অ্যাডভান্সড ও স্পেশালিস্ট পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সার্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছে। তবে, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএসটিবিকে কেবল পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না।

বিএসটিবির লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১০ হাজার সার্টিফায়েড টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার তৈরিতে অবদান রাখা। একইসাথে, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে অ্যাডভান্সড ও স্পেশালিস্ট স্তরের সার্টিফিকেশন, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সাথে যুক্ত করাও এই সংস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

কার্যকর, কর্মক্ষম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাসক্ষম পেশাজীবী তৈরি করাই বিএসটিবির মূল লক্ষ্য।

আগামী ৫ ডিসেম্বর ঢাকার শেরাটনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চতুর্থ এসকিউএটি বাংলাদেশ—সিম্পোজিয়াম অন সফটওয়্যার কিউএ অ্যান্ড টেস্টিং। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কোয়ালিটি ইন দ্য অ্যাজ অব এআই’ বা ‘এআই যুগে মান’।

আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ডের নিজস্ব কনফারেন্স নেটওয়ার্কেও এবারের এসকিউএটি বাংলাদেশকে ৫ ডিসেম্বরের ঢাকার আয়োজন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ডের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া দুসা-জিগার এবং সাবেক গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট অলিভিয়ার ডেনো।

তাঁদের পাশাপাশি একই প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত থাকবেন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কোয়ালিটি ডিরেক্টর, ব্যাংকের সিআইও ও সিটিও, টেলিযোগাযোগ খাতের এআই ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রধান, সরকারের নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং সফটওয়্যার কোয়ালিটি পেশাজীবীরা। এই সমন্বিত প্রয়াস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বাংলাদেশের সফটওয়্যার কোয়ালিটি ইকোসিস্টেমকে বড় করতে কেবল শিল্প, একাডেমিয়া কিংবা সরকার একা সফল হতে পারবে না।

সকল পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

একটি মাত্র সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানি ঘাটতি পূরণ হবে না, কিংবা ১০ হাজার দক্ষ পেশাজীবীও তৈরি হয়ে যাবে না। তবে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম সঠিক মানুষকে একত্রিত করে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরির সূচনা করতে পারে।

এসকিউএটি বাংলাদেশ থেকে আমরা কয়েকটি বাস্তবসম্মত ফলাফল দেখতে প্রত্যাশী।

প্রথমত, সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিংকে একটি স্বতন্ত্র পেশা এবং রপ্তানি সেবা হিসেবে জাতীয়ভাবে আরও দৃশ্যমান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমিয়ে আনা জরুরি।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, ফাউন্ডেশন সার্টিফিকেশন সম্পন্ন পেশাজীবীদের অ্যাডভান্সড ও স্পেশালিস্ট স্তরে উন্নীত করার পথ সুগম করা।

পঞ্চমত, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ফিনটেক, টেলিযোগাযোগ ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি করা অত্যাবশ্যক। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের সফটওয়্যার টেস্টিং সক্ষমতাকে বৈশ্বিক প্রকল্প ও রপ্তানি বাজারের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের স্বপ্ন মোটেও ভুল ছিল না। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গভীর ও পরিমাপযোগ্য ভ্যালু চেইন তৈরিতে ঘাটতি ছিল।

তাই এখন শুধু একটি বৃহৎ রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেই চলবে না; বরং স্পষ্ট করে বলতে হবে কোন কোন সেবা থেকে এই আয় আসবে। কোন ধরনের দক্ষতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, কতজন পেশাজীবী দরকার, এবং তাদের আন্তর্জাতিক মান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে তা নির্ধারণ করা আবশ্যক।

সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স এই প্রশ্নগুলোর অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে পারে। বাংলাদেশ যদি ১০ হাজার আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফায়েড টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে পারে, তাদের অ্যাডভান্সড দক্ষতা প্রদান করতে পারে এবং দেশি-বিদেশি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে তাদের প্রভাব কেবল ১০ হাজার চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এই পেশাজীবীরা দেশের সফটওয়্যার কোম্পানির মানোন্নয়নে অবদান রাখবেন। তারা ব্যাংকিং, ফিনটেক, টেলিকম এবং সরকারি ডিজিটাল সিস্টেমকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, পাশাপাশি বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ও টেস্টিং সার্ভিস রপ্তানি করবেন।

সেই লক্ষ্যেই বিএসটিবি ও এসকিউএটি বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে চায়, যেখানে দক্ষতা থেকে সার্টিফিকেশন, সার্টিফিকেশন থেকে কর্মসংস্থান এবং কর্মসংস্থান থেকে রপ্তানি আয়—পুরো প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য হবে।