Tue 27th Oct 2026, 3:54 pm
|

২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএ: ঢাকায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু

২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএ: ঢাকায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে ঢাকায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে উভয় দেশ।

এর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে মঙ্গলবার সকালে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার এই আলোচনা উদ্বোধন করেন বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।

উদ্বোধনী অধিবেশনে আলোচনার রূপরেখা ও কার্যপরিধি নির্ধারণে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার ৩১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের প্রধান রশিদি সাইদ এবং বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনসহ উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। তিনি জানান, গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে টেকসই ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রথম দফার এই আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো। বাণিজ্যসচিব আরও উল্লেখ করেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এফটিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় একটি বাজার। তিনি হালাল শিল্প, অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগের কথা তুলে ধরেন।

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার প্রতি মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের প্রধান রশিদি সাইদ বলেন, প্রস্তাবিত এফটিএ কেবল শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়; এটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত উদ্যোগ।

তিনি জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২.৮৪ বিলিয়ন বা ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল। চুক্তি কার্যকর হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

রশিদি সাইদ পারস্পরিক সমঝোতা, নমনীয়তা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরে এই প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।

বাংলাদেশের আলোচনা দলের প্রধান খাদিজা নাজনীন বলেন, এফটিএ কার্যকর হলে দুই দেশের বাজার আরও উন্মুক্ত হবে এবং বাণিজ্যবাধা কমবে। এর ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে, বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, সহজ ও অনুমানযোগ্য হবে।

আলোচনায় পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তিবিধি ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রায় ১৪টি দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ করার জন্য প্রায় এক দশক ধরে নানা সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝি মালয়েশিয়া সফর করেন, এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এফটিএ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের। অথচ ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কসুবিধায় দেশটিতে পণ্য রপ্তানি করছে।

এফটিএ কার্যকর হলে এই শুল্ক কমবে, তবে তার সুবিধা নিতে হলে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রথম দফার এই আলোচনা আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।