ইইউতে পোশাক রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বাংলাদেশের

ইইউতে পোশাক রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বাংলাদেশের
ইউরোপের বাজারে সস্তা পোশাক ও ফ্যাশন পণ্যের ব্যবসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসছে। স্বল্পমূল্যের আমদানি পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক ও হ্যান্ডলিং ফি আরোপের ফলে চীন থেকে সরাসরি ছোট পার্সেলে পণ্য পাঠানোর ব্যবসা চাপের মুখে পড়েছে।

অ্যাভিয়েশন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাভিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে চীন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) স্বল্পমূল্যের ই-কমার্স পণ্য পরিবহনে আকাশপথের কার্গো প্রবাহ ৫০ শতাংশ কমেছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে চীনের অতি সস্তা পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ইইউতে নতুন শুল্কনীতির কারণে চীন থেকে সরাসরি পণ্য সরবরাহের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল এখন বড় ধরনের ব্যয়ের সম্মুখীন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে স্বল্পমূল্যের আমদানি পণ্যের ওপর তিন ইউরো শুল্ক কার্যকর হয়েছে, যা প্রতিটি পার্সেলে থাকা পণ্যের শ্রেণি অনুযায়ী আদায় করা হচ্ছে।

এই সাময়িক ব্যবস্থা ২০২৮ সালের জুলাই পর্যন্ত বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অতিরিক্ত, ইউরোপীয় কমিশন আগামী ১ নভেম্বর থেকে আমদানি পণ্যের ওপর আরও দুই ইউরো হ্যান্ডলিং ফি কার্যকর করার কথা জানিয়েছে।

এই নতুন শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেছেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি জানান, যদি পাঁচ ইউরো মূল্যের কোনো পণ্যের ওপর তিন ইউরো শুল্ক সম্পূর্ণভাবে ক্রেতার ওপর চাপানো হয়, তবে এর মোট দাম ৬০ শতাংশ বেড়ে আট ইউরোতে দাঁড়াবে।

একইভাবে, ১০ ইউরোর পণ্যে শুল্কের কারণে দাম ৩০ শতাংশ বাড়বে। এর সঙ্গে আরও দুই ইউরো হ্যান্ডলিং ফি যুক্ত হলে ক্রেতার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, চীনের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাধারণত কারখানা থেকে সরাসরি ক্রেতার কাছে স্বল্পমূল্যের পোশাক ও ফ্যাশনসামগ্রী পাঠিয়ে ইউরোপের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল। কম দাম, দ্রুত সরবরাহ এবং ছোট চালানে বিক্রির সুবিধাই ছিল তাদের ব্যবসার প্রধান ভিত্তি।

কিন্তু নতুন শুল্ক কাঠামোর কারণে এই ধরনের ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়, আগের মতো কম দামে পণ্য সরবরাহ করা এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা সাধারণত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, খুচরা বিক্রেতা ও আমদানিকারকদের মাধ্যমে বড় চালানে পোশাক সরবরাহ করে থাকে। চীনের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো লাখ লাখ ছোট পার্সেলে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠানোর ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যবস্থা নির্ভরশীল নয়।

তাই, নতুন শুল্কের সরাসরি প্রভাব দেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোপের বাজারে অতি কম দামের পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে এলে বাংলাদেশের জন্য এক ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে, ক্রেতারা পণ্যের নির্ভরযোগ্যতা, গুণগত মান, আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ, কমপ্লায়েন্স এবং মূল্য সংযোজনের ওপর জোর দিতে হবে।

কারণ, ইউরোপের বাজারে কেবল কম দামের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে; বরং নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারলেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এই পরিবর্তনের সুফল অর্জন করতে পারবে।