পুঁজিবাজারে আইপিও খরা অবসানের ইঙ্গিত: ৬ কোম্পানির ৬১২ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন

পুঁজিবাজারে আইপিও খরা অবসানের ইঙ্গিত: ৬ কোম্পানির ৬১২ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) এক দীর্ঘস্থায়ী খরা চলছিল, যা আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো নতুন আবেদন বা অনুমোদনের ঘটনা দেখেনি। অবশেষে, এই অচলাবস্থা কাটানোর আভাস নিয়ে ছয়টি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৬১২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা সংগ্রহের জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) আইপিও আবেদন জমা দিয়েছে।

এর মধ্যে পাঁচটি কোম্পানি ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে এবং একটি কোম্পানি বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে আগ্রহী। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আবেদনকারী কোম্পানিগুলো হলো অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স, ডিজিকন টেকনোলজিস, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং এবং স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেড।

অন্যদিকে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য আবেদন করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষে এই কোম্পানিগুলো আইপিওর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করতে পারবে, যা দীর্ঘদিনের এই খরার অবসান ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী মন্তব্য করেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি হয়নি, যা বাজারের গতি ফিরিয়ে আনতে এবং নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে অত্যন্ত জরুরি। তিনি অতীতে বহু নামসর্বস্ব ও দুর্বল কোম্পানিকে বাজারে আনার ফলে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

নতুন কমিশন কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই আইপিও অনুমোদন দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে সর্বশেষ টেকনো ড্রাগস নামের একটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছিল বিএসইসি, যার লেনদেন শুরু হয় ওই বছরের জুলাই মাসে।

এরপর আর কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদনের ঘটনা ঘটেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বিএসইসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান এবং তিনি আইপিও বিধিমালাসহ বেশকিছু বিধিমালা নতুন করে প্রণয়নের উদ্যোগ নেন।

তার সময়ে দুর্বল, লোকসানি ও নামসর্বস্ব অনেক কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি, যা পূর্ববর্তী শাসনামলে ঘটেছিল এবং বেশিরভাগই বর্তমানে বড় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মাকসুদ কমিশন এ ধরনের কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিল, যার ফলে বেশকিছু আবেদন থাকা সত্ত্বেও কোনো আইপিও অনুমোদন পায়নি।

পাশাপাশি, নতুন বিধিমালা কার্যকর না হওয়ায় আইপিও আবেদনেও তেমন সাড়া মেলেনি। গত জুন মাসে রাশেদ মাকসুদসহ কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করার পর করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় সরকার।

মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর আইপিও বিধিমালা সংশোধনের কথা জানান এবং ইতোমধ্যে বিধিমালার খসড়া জনমত যাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। এরই মধ্যে বিদ্যমান বিধিমালা, অর্থাৎ আইপিও বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী এই ছয়টি কোম্পানির আবেদন বিএসইসিতে জমা পড়েছে।

দাখিলকৃত নথি অনুযায়ী, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স ২৫ কোটি টাকা, ডিজিকন টেকনোলজিস ৩০ কোটি টাকা এবং প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়, যেখানে প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের সঙ্গে পাঁচ টাকা প্রিমিয়াম যোগ করে ১৫ টাকা দরে মোট ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন করেছে।

স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেড শেয়ারপ্রতি ২০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩০ টাকা দরে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদনকারী কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিডসংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে।

বাকি ৯০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পরিশোধে এবং ১০ কোটি টাকা আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। স্ক্যানডেক্স তাদের সংগৃহীত অর্থ দিয়ে টেক্সটাইল ও রিসাইকেল্ড ফাইবার স্পিনিং প্রকল্প স্থাপন এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে চায়।

অন্যদিকে, পার্কওয়ে প্যাকেজিং কারখানার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধে অর্থ ব্যয় করবে। ডিজিকন টেকনোলজিস বিপিও ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।

অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স ও প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স আইপিও থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বন্ড এবং অন্যান্য অনুমোদিত আর্থিক খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।