Thu 23rd Jul 2026, 2:31 am

৬ বছর বয়সী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এনআইডি প্রদানের পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের: ১৮ বছর হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য

৬ বছর বয়সী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এনআইডি প্রদানের পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের: ১৮ বছর হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ৬ বছর বয়সী অথবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নিবন্ধনের অধীনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বয়স বা তথ্য গোপন করে ভোটার হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে, পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এর কারণ হলো, যদি একজন ব্যক্তি শুরু থেকেই তার এনআইডি তথ্য ব্যবহার করে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তবে ভুল-ভ্রান্তির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকবে।

শিশুদের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের শারীরিক গঠনে, বিশেষত চেহারায় পরিবর্তন আসবে—এই বিষয়টি উত্থাপন করা হলে সূত্র জানায় যে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রতি ১৫ বছর অন্তর এনআইডির ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদের বিধান রয়েছে। এই উদ্যোগের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা এ প্রসঙ্গে বলেন, এই পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক আলোচনার স্তরে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তার মতে, সারা দেশের নাগরিকদের একটি একক পরিচয়ের আওতায় নিয়ে আসা মূল লক্ষ্য, পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য এবং ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী, ৬ বছর বয়স থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের এই পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, জন্মলগ্ন থেকেই একজন ব্যক্তির জন্য একটি স্থায়ী পরিচয় (লাইফলং আইডেন্টিটি) নিশ্চিত করার ধারণাটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শৈশব থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় নম্বর থাকলে নাগরিক পরিষেবা প্রাপ্তি সহজতর হবে। বস্তুত, নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই ছিল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা ৬ বছর বয়সী শিশুদের এই ব্যবস্থার অধীনে আনতে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হলেও সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। যেহেতু বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছেও শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিদ্যমান, তাই স্কুলভিত্তিক এই কার্যক্রম পরিচালনা করা ততটা দুরূহ হওয়ার কথা নয়। তবে তিনি সতর্ক করেন যে, ছোট শিশুদের পূর্ণাঙ্গ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, কারণ একজন মানুষের বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে পরিপক্ব হতে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর সময় লাগে। সুতরাং, প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করে পরে উপযুক্ত বয়সে পূর্ণাঙ্গ বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদ করা যেতে পারে।

জেসমিন টুলী জোর দিয়ে বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ অত্যাবশ্যক। তাড়াহুড়ো করে বা অসম্পূর্ণভাবে এই উদ্যোগ শুরু করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নাও আসতে পারে। বরং, ধাপে ধাপে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পিত উপায়ে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি অত্যন্ত সফল ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ১৬ বছর বয়সীদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের লক্ষ্যে একটি পরিপত্র জারি করে ইসি। এতে বলা হয়, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০ (২০১৩ সালে সংশোধিত)-এর ধারা ৫ অনুযায়ী, আবেদন করার তারিখে যেসব বাংলাদেশি নাগরিকের বয়স ১৬ বা ১৭ বছর পূর্ণ হয়েছে বা হবে, তাদের নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সে সময় ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছিলেন যে, ১৬ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের জন্য নিবন্ধন তথ্য সংগ্রহ করবে নির্বাচন কমিশন। তাদের বয়স ১৮ বছর হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ১৬ বছর বয়সী ব্যক্তিরা নিবন্ধন করতে পারবেন, যার মাধ্যমে আগাম তথ্য সংগৃহীত হবে এবং তারা এনআইডি লাভ করবেন।

ইসি সচিব ১৬ বছর বয়সীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের অপরিহার্যতা তুলে ধরে বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের এনআইডি প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থী, ব্যাংক হিসাব খোলা, চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ কাজে এনআইডি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আর ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলেই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় নাম লেখাতে পারবেন।

বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৩১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৪৩ জন।