Sun 20th Sep 2026, 12:46 pm

ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে আধুনিক স্যান্ডেলে রূপান্তর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা

ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে আধুনিক স্যান্ডেলে রূপান্তর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা
টাঙ্গাইলের নিজ গ্রামের আবহে অপূর্ব কৃষ্ণ দে শৈশব থেকেই মূর্তা বা বেতিগাছের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত। এই গাছের প্রাকৃতিক তন্তু থেকে উৎপাদিত ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট কারুশিল্পীদের কারিগরী নৈপুণ্য তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
কালের পরিক্রমায় শীতলপাটির ব্যবহারিক চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় এর ওপর নির্ভরশীল কারুশিল্পীদের জীবিকা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অপূর্ব চিন্তা করছিলেন যে, শীতলপাটিকে শুধুমাত্র মাদুর হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি নিত্যব্যবহার্য অন্য কোনো পণ্যে রূপান্তর করা যায়, তবে কেমন হবে?
এই সৃজনশীল ভাবনা থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার মেধাবী শিক্ষার্থী ‘বুনন বাজার’ নামক একটি অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। দলের অন্যতম সদস্য অপূর্ব কৃষ্ণ দে ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর সহযোদ্ধারা হলেন ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের আবির দে, মো. আশিক মিয়া এবং চৌধুরী খুবাইব বিন করিম। তাঁদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে নতুন আঙ্গিকে নকশা করে স্যান্ডেলে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে এটি একটি ধারণামাত্র ছিল। পরবর্তীতে, এই চার শিক্ষার্থী বিভিন্ন আইডিয়া উপস্থাপনমূলক পিচিং এবং প্রতিযোগিতায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমও এই উদ্যোগকে সুদূরপ্রসারী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষত, এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট কোর্সের ব্যবহারিক অংশে তাঁরা ‘বুনন বাজার’ নিয়েই গভীরভাবে কাজ করেন। এক্ষেত্রে ক্রেতার চাহিদা, বাজারের সম্ভাব্যতা, প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি, কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল, বিপণন কৌশল, সার্বিক পরিচালনা, আর্থিক ও অর্থনৈতিক ফিজিবিলিটি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি—এই সকল বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। চৌধুরী খুবাইব বিন করিম উল্লেখ করেন, ‘আমাদের শিক্ষাজীবন কেবল ‘বুনন বাজার’ এর ধারণা সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এই ধারণাকে কীভাবে একটি বাস্তবসম্মত এবং সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়, সেই পথও উন্মোচন করেছে।’ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে প্রাপ্ত গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা তাঁদের ধারণাকে আরও পরিশীলিত করেন। পরবর্তীতে দ্য আর্থ সোসাইটি এবং নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত গ্রিন ভয়েস মাস্টার বুটক্যাম্প থেকে এক লাখ টাকা প্রাথমিক তহবিল সংগ্রহ করে পণ্য উৎপাদনের কাজ শুরু হয়।
তবে শীতলপাটিকে স্যান্ডেলের মতো একটি টেকসই ও আরামদায়ক পণ্যে রূপান্তর করা সহজসাধ্য ছিল না। প্রাথমিকভাবে, বিভিন্ন প্রকার বুনন শৈলী, আকার, কাটিং প্যাটার্ন, স্ট্র্যাপের বিন্যাস এবং সোলের সাথে পাটিকে সংযুক্ত করার কৌশল নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে। উদ্যোক্তারা কেবল প্রচলিত শীতলপাটি ব্যবহার করেননি, বরং স্যান্ডেল তৈরির উপযোগী করে বিশেষ ধরনের পাটি তৈরি করে সেটিকে কাজে লাগিয়েছেন। চৌধুরী খুবাইব বিন করিম জানান, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি সময় এবং কারিগরি দক্ষতা ব্যয় হয়েছে শীতলপাটির সঠিক পরিমাপ, সুনির্দিষ্ট আকার, নান্দনিক ডিজাইন এবং মানানসই সাইজিং নির্ধারণে। শীতলপাটির সহজাত বুনন ও টেক্সচার অক্ষুণ্ণ রেখে এটিকে পায়ের আকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম তৈরি নমুনা স্যান্ডেলটিই চূড়ান্ত রূপ পায়নি; বরং ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের গঠনমূলক মতামতের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে পরিমার্জন করে বর্তমান নকশায় উপনীত হয়েছি আমরা।’ বর্তমানে এই উদ্যোক্তারা প্রতিটি শীতলপাটির স্যান্ডেল ৬৫০ টাকায় বাজারজাত করছেন।
এই চার শিক্ষার্থী বাজারের উপযোগিতাও নিপুণভাবে যাচাই করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় ‘বুনন বাজার’ প্রথম রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এছাড়াও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় তাঁরা শীর্ষ ৮টি উদ্যোগের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। এই সাফল্যের ফলস্বরূপ, আকিজ রিসোর্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁরা চারজনই মূল্যবান ইন্টার্নশিপের সুযোগ লাভ করেছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও তাঁদের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রদর্শিত ও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এই সামগ্রিক যাত্রাপথে, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি আর্থ সোসাইটির মেন্টরশিপ (বিশেষজ্ঞ পরামর্শ) এবং কৌশলগত ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে তাঁদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পণ্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং কার্যকরভাবে তা গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কেবল স্যান্ডেল উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁরা ব্যাগ, গৃহসজ্জার উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির কথা ভাবছেন। তাঁদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় রয়েছে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে প্রশিক্ষিত কারুশিল্পীদের একটি শক্তিশালী দল গঠন এবং ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। চৌধুরী খুবাইব বিন করিম দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন কেবল ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা নয়, বরং এটিকে নতুন আঙ্গিকে পুনরুজ্জীবিত করে বাঁচিয়ে রাখা।’