Fri 24th Jul 2026, 2:54 am

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ তদন্তে সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলন ও ‘পর্দা লঙ্ঘন’ প্রমাণিত

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ তদন্তে সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলন ও ‘পর্দা লঙ্ঘন’ প্রমাণিত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিষ্কার করেছে। দলীয় তদন্তে তাঁর ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জামায়াত এই বহিষ্কারাদেশ নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

গত তিন দিন ধরে গাজী নজরুলের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গত বুধবার জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এই বৈঠক সম্পন্ন হয়।

বৈঠক শেষে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানান। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজী নজরুলকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

৭৪ বছর বয়সী গাজী নজরুল এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ১৯৯১ সালে প্রথম সাতক্ষীরা–৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি জামায়াতের সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমির এবং দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতের খুলনা অঞ্চলের পরিচালক ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাতক্ষীরা–২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আবদুল খালেক। ইজ্জত উল্লাহ পাশের সাতক্ষীরা–১ আসনের সংসদ সদস্য।

গত মঙ্গলবার সাতক্ষীরায় তদন্ত কমিটির কাছে নিজের বক্তব্য দেন গাজী নজরুল। কমিটি তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ করে এবং ঘটনার আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রে জমা দেয়। ওই প্রতিবেদন গতকাল দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে আলোচনার পর গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

কী ধরনের নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পেয়ে তাঁকে বহিষ্কার করা হলো—এ প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য Desi Media Point-কে বলেন, তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেয়েছে যে, গাজী নজরুল বিয়ের আগে ওই নারীর সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ‘পর্দা লঙ্ঘন’ করেছেন। তা ছাড়া এই ঘটনায় সংগঠনের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু রুকনিয়্যত বা রুকন পদ বাতিল করে এত বড় ক্ষতি লাঘব হবে না বলেই তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জামায়াতের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর আত্মীয়। তিনি ঢাকায় এলে মাঝেমধ্যে ওই আত্মীয়র বাসায় উঠতেন।

গত সোমবার রাতে গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়। প্রথম দিকে জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করেন।

তবে পরদিন গাজী নজরুল নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। গত ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

জামায়াত, গাজী নজরুল ও তাঁর পরিবারের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো বিয়ের পরের এবং প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতেই বিয়ে হয়েছে। তবে গাজী নজরুল নৈতিক স্খলনের পাশাপাশি একটি চক্রের ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়েছেন বলেও মনে করেন জামায়াতের কোনো কোনো নেতা।

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল নিজ নির্বাচনী এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গাজী নজরুলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা এবং তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। ‘শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ’–এর ব্যানারে এ কর্মসূচি হলেও এতে স্থানীয় বিএনপি ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

বক্তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁরা বলেন, এ ঘটনায় শ্যামনগরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে দল তাঁকে বহিষ্কার করলে আসন শূন্য হবে কি না, এ বিষয়ে অনুচ্ছেদটিতে কিছু বলা নেই।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং পদে বহাল থাকার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়গুলো বিধৃত আছে। এর একটি হলো নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ। তবে শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

জামায়াত দলীয় তদন্তের ভিত্তিতে গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু তিনি এ-সংক্রান্ত কোনো ফৌজদারি অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হননি। ফলে দলটির অভিযোগের কারণে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে না।

তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদও শূন্য হয়ে যাবে। তাঁর যুক্তি, দলীয় সংসদ সদস্যরা দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচিত হন। বহিষ্কারের পর তিনি আর ওই দলে থাকেন না; আবার নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগও নেই।

তবে সংবিধানের অস্পষ্টতা ও অতীতের নজিরের কারণে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করতে পারে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে যাওয়ার পর কী সিদ্ধান্ত হয়, তার ওপর।

এদিকে গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেছেন তাঁর গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। সংসদ সদস্য যাঁকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, ওবায়দুর রহমান তাঁর মামা।

গত ২১ জুলাই করা এই মামলায় ওবায়দুর রহমান অভিযোগ করেছেন, সংসদ সদস্যের ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ প্রতিবাদ করায় এবং একটি ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় তাঁর হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করে তাঁকে মারধর করা হয়েছে। গাজী নজরুলের আরও চার সহযোগীকেও আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন আমিনুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ (৪১), মোস্তাসিম বিল্লাহ (২৫) ও রাকিবুল হাসান (৩০)।

এ মামলায় আমিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হুদা গতকাল বুধবার আমিনুরকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন। আদালত আমিনুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলাটি তদন্ত করে আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওবায়দুর রহমান রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার ‘রোজগার্ডেন টাওয়ার’-এ তাঁর বোনের বাসায় থাকতেন। তিনি গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলামের ওই বাসায় যাতায়াত ছিল। একপর্যায়ে ওবায়দুরের ভাগনির সঙ্গে নজরুল ইসলামের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানতে পেরে ওবায়দুর পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে এ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নজরুল ইসলাম তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেন।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি মগবাজারের একটি চক্র নজরুল ইসলাম ও ওই তরুণীর কিছু ‘অপ্রীতিকর ভিডিও’ সংগ্রহ করে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে। এতে নজরুল ইসলামের সন্দেহ হয়, ওবায়দুরই গোপনে ভিডিও ধারণ করে সংবাদমাধ্যম ও ওই চক্রের কাছে দিয়েছেন। সেই সন্দেহ থেকেই ১৪ জুলাই তাঁর নির্দেশে অন্য আসামিরা ওবায়দুরের ওপর হামলা চালান।

বাদী ওবায়দুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন বেলা ১১টার দিকে আমিনুর রহমান কৌশলে তাঁকে বাসার ড্রয়িংরুমে ডেকে নেন। সেখানে অন্য আসামিদের সঙ্গে নিয়ে লাঠি দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আমিনুর তাঁকে মেঝেতে ফেলে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর মা তাহমিনা ও ছোট বোন মীম চিৎকার করলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান। পরে আহত অবস্থায় তিনি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।