Sun 26th Jul 2026, 3:10 am

সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনকাঠামো: বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে

সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনকাঠামো: বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে
সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের অন্তিম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। 'জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫' কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশমালা পর্যালোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি চলতি মাসেই তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সুপারিশমালা পরবর্তীতে মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হবে। সরকার আগস্ট মাসের মধ্যে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও এর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হবে।

অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নতুন বেতনকাঠামোটি একক ধাপে কার্যকর হবে নাকি একাধিক ধাপে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভা কর্তৃক গৃহীত হবে। গেজেট প্রকাশ আগস্টে সম্পন্ন হলেও, এর আর্থিক প্রভাব চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে প্রযোজ্য হবে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন পরিবর্তনগুলো কেবল মূল বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিছু ভাতা একত্রিত করা হতে পারে এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন কিছু সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

অবসরকালীন সুবিধা এবং পেনশন কাঠামোতেও সংস্কারের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করার জন্য একাধিক বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) জারি করার প্রয়োজন হবে। ফলস্বরূপ, অর্থ বিভাগকে প্রয়োজনীয় এসআরও'র খসড়া প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

'জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫' সম্পর্কিত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সভায় এসব বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সচিব কমিটি এর কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠাবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই (ভেটিং), প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি এবং গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ সালে ঘোষিত হয়েছিল। যদিও প্রতি বছর মূল বেতনের ওপর ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট কার্যকর ছিল, একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন বেতনকাঠামো এরপর আর ঘোষণা করা হয়নি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গঠন করে। গত ২২ জানুয়ারি কমিশন সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমানের ৮,২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া, বৈশাখী ভাতা বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতাসহ আরও কয়েকটি খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাবও কমিশন পেশ করেছে।

গত ২১ এপ্রিল এই সুপারিশমালা পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সদস্যরা হলেন: প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক।

এই কমিটির ম্যান্ডেট হলো 'জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫', 'বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫' এবং 'সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫'-এর প্রতিবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য সুপারিশ করা। এই কমিটির প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত বেতনকাঠামো অনুমোদন করবেন।

সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তার মতে, এবার নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এই বিবেচনায়, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক অধিক বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ আসতে পারে। অন্যদিকে, ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি থাকবে, তবে এর হার তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমান, ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, দীর্ঘ বিরতির পর নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, তারা কেবল মূল বেতন বৃদ্ধিই নয়, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বাস্তবসম্মত সংস্কারও প্রত্যাশা করেন।

নতুন বেতনকাঠামো কত ধাপে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে সচিব কমিটি কোনো চূড়ান্ত সুপারিশ করেনি। প্রাথমিকভাবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব ছিল, পরবর্তীতে দুই ধাপের বিকল্পও বিবেচিত হয়। বর্তমানে এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে মন্ত্রিসভার এখতিয়ারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১.৩১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কমিশনের প্রাক্কলন অনুসারে, নতুন কাঠামো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১.০৬ লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে, সে বিষয়েও মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, ১১ বছর পর নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের ফলে কোনো গ্রেড যেন বঞ্চনার শিকার না হয়, সে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই কারণে কমিটি প্রতিটি আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে।

২০১৫ সালের বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় এসেছে। সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী মত প্রকাশ করেছেন যে, সেবার বেতনকাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়িত হয়েছিল—প্রথম বছরে মূল বেতন এবং পরবর্তী বছরে বিভিন্ন ভাতা। তার মতে, আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে এবারও দুই ধাপে বাস্তবায়ন একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।

তিনি আরও যুক্তি দেন যে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা থাকলেও, বাজারের অন্যান্য খাতের অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া অত্যাবশ্যক।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯,৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দের পরিমাণ ১,৪১,৪৩৪ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত বরাদ্দের অন্তত ৪৪,০০০ কোটি টাকা নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বাজেট বক্তৃতায় নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হবে এবং এর কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে গণনা করা হবে।

২০১৫ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ নতুন বেতনকাঠামো। গত এক দশকে কেবল বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে মূল বেতন বৃদ্ধি পেলেও, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং ভাতার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন মূল বেতন, ভাতা, পেনশন এবং অবসর-সুবিধাসহ সবকিছু পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করেছে। এখন সেই সুপারিশ চূড়ান্ত রূপ পেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ব্যবস্থায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।