জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং গ্রিস সমন্বিতভাবে এই পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের অধীনে, উল্লিখিত দেশগুলোর কোনোটিতে আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে নাকচ হলে বাংলাদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের আশ্রয়প্রার্থীদের সাময়িকভাবে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রে স্থানান্তরিত করা হবে। কেনিয়াসহ আফ্রিকার একাধিক দেশ এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বাগতিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রাথমিক আলোচনা চলমান রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। এই পাঁচটি দেশের মধ্যে গ্রিস 'রিটার্ন হাব' বাস্তবায়নে সাম্প্রতিককালে উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা প্রদর্শন করেছে। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে অবহিত করেছে যে, চলতি বছরেই গ্রিস ও অন্যান্য চারটি দেশ তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে 'রিটার্ন হাব' স্থাপনের চুক্তি সম্পন্ন করতে পারে এবং আগামী বছরেই এই প্রক্রিয়া কার্যকরের সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন 'রিটার্ন রেগুলেশন' থেকেই এই পাঁচ দেশের উদ্যোগের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে। এই প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের সাপেক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে 'রিটার্ন হাব' স্থাপনের সুযোগ প্রদান করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং গ্রিস সম্ভাব্য স্বাগতিক রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। পরিকল্পনামাফিক, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের নিজ দেশে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের সাময়িকভাবে এই 'রিটার্ন হাব'-এ রাখা হবে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সাথে সমন্বয় সাধন করে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ইউরোপীয় কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য 'রিটার্ন হাব' স্থাপনের জন্য আফ্রিকার কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া এবং এশিয়ার উজবেকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সক্ষমতা, আগ্রহ এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার মাত্রা যাচাই করা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কোনো দেশই এ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা প্রদান করেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, 'রিটার্ন হাব' সংক্রান্ত ইউরোপের পাঁচ দেশের এই উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো অবহিত করা হয়নি। এর কারণ হলো, বিষয়টি বর্তমানে নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এটি নিয়ে আলোচনা চলমান। প্রস্তাবটি নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যেও মতপার্থক্য বিদ্যমান, ফলে বাংলাদেশসহ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা সংঘটিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিমত অনুযায়ী, এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য পৃথক কোনো উদ্যোগ নয়; বরং যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য হতে পারে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, যাদের আশ্রয় আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে, তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরিত করা। সেই দেশে অবস্থানের পর সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, 'বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইউরোপে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন অনুমোদনের হার অত্যন্ত কম, যদিও আবেদনকারীর সংখ্যা বিপুল। বর্তমানে প্রাথমিক স্বীকৃতির হার প্রায় ৩-৪ শতাংশ। তৃতীয় কোনো দেশে 'রিটার্ন হাবে' প্রেরণের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং এই সংক্রান্ত রেগুলেশন অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার যে নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা কার্যকরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলস্বরূপ, ভবিষ্যতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নতুন আশ্রয় আবেদন পূর্বের তুলনায় দ্রুততর সময়ে নিষ্পত্তি করা হবে।' ওই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, 'প্রস্তাবিত 'রিটার্ন রেগুলেশন' অনুসারে, নতুন আবেদনগুলি প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন এই সময়ের মধ্যে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, সেগুলির ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।' আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন উদ্যোগের সমর্থনে সংশ্লিষ্ট পাঁচ দেশের যুক্তি হলো, বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যাদের প্রত্যাবাসন বা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম সংখ্যককে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। এর ফলে বিপুল সংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে অবস্থান করে যান এবং আশ্রয় ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন। দেশগুলোর ধারণা, 'রিটার্ন হাব' চালু হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে। এই পরিকল্পনাটি অবশ্য শুরু থেকেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার পাঁচ দেশের সরকারকে প্রেরিত এক চিঠিতে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং 'নন-রিফাউলমেন্ট' নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করে বলেছে যে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, কার্যকর বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টির তাৎপর্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) 'লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫' প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। বাংলাদেশের পূর্বে রয়েছে যথাক্রমে সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং আফগানিস্তান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপের দেশগুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মোট ৩৬,৯০৪টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে ৩৫,২৪৫টি ছিল প্রথমবারের মতো করা আবেদন। একই সময়ে, ৪৩,৫২৩টি বাংলাদেশি আবেদনের উপর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। তবে, বছরের শেষ নাগাদ বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রে ৪১,৬৯২টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। একই বছরে ১,১৭০টি আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশি আশ্রয় আবেদনগুলির প্রাথমিক স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ইইউএএ-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সংঘটিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়াবলী অনেক বাংলাদেশি তাদের আশ্রয় আবেদনে উল্লেখ করেছেন। একই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালে আশ্রয় আবেদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেলেও, বাংলাদেশ এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম প্রধান উৎস দেশ হিসেবে বিবেচিত। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাঁচ দেশের 'রিটার্ন হাব' উদ্যোগ সম্পর্কে সরকারিভাবে বাংলাদেশকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেছেন, 'এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগ আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।' প্রতিমন্ত্রী আরও মন্তব্য করেন, 'বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি বিদ্যমান নেই। দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত হয়েছে এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং, বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমি দেখি না।' মো. নুরুল হক আরও যোগ করেন, 'সরকার সর্বদা অনিয়মিত অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করে। আমরা প্রত্যাশা করি, সবাই বৈধ এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদেশে গমণ করুক। তবে দেখা যায়, অনেকে অনিয়মিত পথে ইউরোপে পৌঁছে পরবর্তীতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। আমরা শুরু থেকেই এই ধরনের প্রবণতার প্রতি নিরুৎসাহ প্রদান করে আসছি।' সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে যে, রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন যদি কেবল অভিবাসনের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ব্যক্তি ও দেশ উভয়ের জন্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হওয়া উচিত নয় যে, এখানে বসবাসের পরিবেশ অনুপস্থিত বা নাগরিকরা অনিরাপদ। বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন দেশের ভাবমূর্তির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইউরোপীয় কমিশনের নতুন 'রিটার্ন' নীতি প্রস্তাব এবং পাঁচ দেশের 'রিটার্ন হাব' উদ্যোগ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই উদ্যোগগুলির যেকোনো একটি বা একাধিক কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তি, প্রত্যাবাসন এবং সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনার উপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেছেন, 'আমি মনে করি, এ ধরনের উদ্যোগ মানবতাবিরোধী। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।' ড. তাসনিম সিদ্দিকী ব্যাখ্যা করে আরও বলেন, 'অস্ট্রেলিয়ার 'অফশোর প্রসেসিং' ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, এ ধরনের নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিচারিক প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। অতএব, ইউরোপ যদি একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়, তবে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।'
