Sun 2nd Aug 2026, 2:59 am

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ১% ন্যূনতম করের বোঝা: অস্তিত্বের সংকট ও টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ১% ন্যূনতম করের বোঝা: অস্তিত্বের সংকট ও টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিটি দেশের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য চালিকাশক্তি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ পর্যন্ত তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম। তবে, সম্প্রতি প্রণীত অর্থ আইন, ২০২৬ দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩(৬) ধারায় আনীত সংশোধনের ফলস্বরূপ, ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের জন্য পূর্বে বিদ্যমান চার কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভারের ওপর কর অব্যাহতির বিধানটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে, এখন থেকে তাঁদের মোট বিক্রয় বা টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ হারে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর আরোপ করা হবে। যদিও এটি আপাতদৃষ্টিতে রাজস্ব বৃদ্ধির একটি কৌশল মনে হতে পারে, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক অস্তিত্বকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে।

পূর্ববর্তী কর কাঠামো অনুযায়ী, যে কোনো উদ্যোক্তার বার্ষিক টার্নওভার চার কোটি টাকার নিচে থাকলে তিনি তার প্রকৃত নিট মুনাফার ভিত্তিতে এবং ব্যক্তিগত করদাতার জন্য নির্ধারিত ধাপ অনুসারে আয়কর পরিশোধ করতেন। এই পদ্ধতিতে, ব্যবসায় লোকসান হলে বা মুনাফা হ্রাস পেলে করের বোঝাও আনুপাতিক হারে কমত। কিন্তু নবপ্রবর্তিত বিধানে, মুনাফার পরিবর্তে বিক্রয় অঙ্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, ব্যবসা লাভজনক হোক বা লোকসানে চলুক, মোট বিক্রয়ের ১ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে কর হিসেবে প্রদান করতে হবে। যদিও এই নিয়ম সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হতে পারে, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে।

এই নতুন আইনের প্রভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর আরোপিত করের ভার কতটা বেড়েছে, তা সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় এবং তা রীতিমতো বিস্ময়কর। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যবসায়ীর বার্ষিক বিক্রি যদি ৫০ লাখ টাকা এবং সকল ব্যয় বাদ দিয়ে করযোগ্য আয় আড়াই লাখ টাকা হয় (৫ শতাংশ নিট মুনাফা অনুমান করে), পূর্ববর্তী নিয়মে তাকে কোনো আয়করই পরিশোধ করতে হতো না। কারণ, আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় ছিল করমুক্ত সীমার আওতাধীন। কিন্তু বর্তমান বিধানে, তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ৫০ হাজার টাকা ন্যূনতম কর হিসেবে প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ, যে ব্যবসায়ী পূর্বে শূন্য কর প্রদান করতেন, তাকে এখন প্রাথমিক পর্যায়েই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ (৫০ হাজার টাকা) অর্থ ব্যয় করতে হবে।

অনুরূপভাবে, এক কোটি টাকা টার্নওভার এবং পাঁচ লাখ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে পূর্বে করের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। অথচ, নবপ্রবর্তিত বিধানে তাকে এক লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর মাধ্যমে করের বোঝা এক লাফে ৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই কোটি টাকা বিক্রয় এবং ১০ লাখ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে পূর্বে যেখানে ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা কর পরিশোধ করতে হতো, তা বর্তমানে দুই লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ১৯৬ শতাংশ কর বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

তিন কোটি টাকা টার্নওভারের ব্যবসায় পূর্বে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর ধার্য ছিল, যা বর্তমানে দ্বিগুণ হয়ে তিন লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এমনকি চার কোটি টাকার সামান্য নিচে, অর্থাৎ ৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা টার্নওভারের ক্ষেত্রেও করের পরিমাণ প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে চার লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, ব্যবসার আকার যত ক্ষুদ্র, করের বোঝা বৃদ্ধির হার সেখানে তত বেশি।

নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পরিবর্তন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত, এটি ব্যবসায়ীদের মূলধন ক্ষয়ের একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষত, যেসব ব্যবসায়ী ট্রেডিং বা স্বল্প মুনাফার ব্যবসায় জড়িত, যেখানে লাভের হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ, তাদের জন্য ১ শতাংশ টার্নওভার কর পরিশোধ করা মানে হলো, তাদের মোট মুনাফার অর্ধেক বা তারও বেশি সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া।

যদি কোনো বছর ব্যবসা লোকসানে চলে, তবে করের অর্থ পকেট থেকে অথবা ব্যবসার মূলধন থেকে উত্তোলন করে পরিশোধ করতে হবে। এর ফলস্বরূপ, সাধারণ উদ্যোক্তারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে চরম অনীহা প্রকাশ করতে পারেন। তারা হয়তো ভাবতে পারেন যে, কর ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হওয়ার চেয়ে এর বাইরে থাকাই অধিকতর নিরাপদ।

দ্বিতীয়ত, এই কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্বচ্ছতা এবং কর ফাঁকির প্রবণতা বৃদ্ধি করতে পারে। করের অতিরিক্ত বোঝা এড়াতে অনেক ব্যবসায়ী তাদের প্রকৃত বিক্রির হিসাব গোপন করার চেষ্টা করবেন। এর ফলে বাজারে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। স্বচ্ছ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করার পরিবর্তে ব্যবসায়ীরা নগদ লেনদেনে অধিক আগ্রহী হবেন। ফলস্বরূপ, অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পরিধি প্রসারিত হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ডিজিটালাইজেশন এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধের লক্ষ্যকে ব্যাহত করবে।

পরিশেষে উল্লেখ্য যে, সরকার অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি সাধনে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে পাঁচ ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপ কোম্পানির বিক্রয়ের ওপর ন্যূনতম কর প্রত্যাহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসার দাবিদার।

তবে, চার কোটি টাকার নিচে টার্নওভার থাকা প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর এই ১ শতাংশ ন্যূনতম করের বোঝা তাদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাতস্বরূপ। লোকসানে থাকা সত্ত্বেও কর পরিশোধের এই বিধানটি মুনাফাকেন্দ্রিক ন্যায়সংগত করনীতির মৌলিক দর্শনের পরিপন্থী। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাতে কর ব্যবস্থার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে সততা ও স্বচ্ছতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সেজন্য এই বিধানটি জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা অপরিহার্য। অন্যথায়, করের এই অতিরিক্ত ভার ক্ষুদ্র শিল্প খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে।