Tue 4th Aug 2026, 3:26 am

হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণ: শিশুদের চিকিৎসায় নতুন জটিলতা

হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণ: শিশুদের চিকিৎসায় নতুন জটিলতা
হাম (Measles) আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এডিনো ভাইরাসের (Adenovirus) সহ-সংক্রমণ রোগের জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াচ্ছে এবং রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে (Bangladesh Shishu Hospital and Institute) পরিচালিত পরীক্ষায় হাম আক্রান্ত বেশ কিছু শিশুর শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমান হাম পরিস্থিতির সামগ্রিক বিশ্লেষণে এডিনো ভাইরাসের ভূমিকা গভীরভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।
শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে (Directorate General of Health Services) এডিনো ভাইরাসের এই উদ্বেগের বিষয়টি অবহিত করলেও, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং তাদের প্রধান রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা, সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC), এই বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সিডিসি’র বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা এই সংকট প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, এডিনো ভাইরাস কোনো নতুন জীবাণু নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি বহু বছর ধরে বিদ্যমান এবং বছরজুড়েই এর উপস্থিতি দেখা যায়। সাধারণত এটি জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো হালকা উপসর্গ সৃষ্টি করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিরা দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন। তবে, যখন হাম ও এডিনো ভাইরাসের সংক্রমণ যুগপৎভাবে ঘটে, তখনই রোগীর অবস্থার মারাত্মক অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা আবারও জোর দিয়েছেন যে, চলমান হাম পরিস্থিতি মূল্যায়নে এডিনো ভাইরাসের সহ-সংক্রমণকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।
গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত হাম ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে হাম ও এডিনো ভাইরাসের যুগপৎ সংক্রমণের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল। তবে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ Desi Media Point-কে জানান, "হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহ-সংক্রমণের বিষয়টি আমি আগে কখনো শুনিনি। শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এই বিষয়ে আমাদের অবগত করেনি। তারা একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে আমাদের জানাতে পারতো।" যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, কীভাবে সিডিসি-আটলান্টা এই তথ্য জানতে পারল অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবগত নয়, বিশেষত যখন তাদের কার্যালয়েই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তখন তিনি মন্তব্য করেন, "আমি ওই সভার কথা স্মরণ করতে পারছি না।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদের উল্লিখিত মন্তব্যের পরেও, এটি উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের সর্বাধিক চিকিৎসা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিশু হাসপাতাল অন্যতম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুরুতর জটিলতার সম্মুখীন শিশুরা প্রায়শই এই হাসপাতালে রেফার করা হয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম Desi Media Point-কে বলেন, "আমরা লক্ষ্য করছিলাম যে, হামে আক্রান্ত কিছু শিশুর স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে না এবং প্রচলিত কোনো চিকিৎসায় তারা সাড়া দিচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আমরা এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করি এবং শিশুদের অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে শুরু করি।"
এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবেলায়, হাসপাতালের চিকিৎসকরা, বিশেষ করে যেসব শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং যাদের শরীরে কোনো ঔষধ কাজ করছে না, তাদের জন্য 'রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট' (Respiratory Panel Test) শুরু করেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে একইসাথে পাঁচ থেকে ছয়টি ভিন্ন ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব। পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা বিস্মিত হয়ে দেখেন যে, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের মধ্যে হামের পাশাপাশি এডিনো ভাইরাসের সংক্রমণও বিদ্যমান। এ পর্যন্ত মোট ৩৫ জন হাম আক্রান্ত শিশুর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ জনের নমুনায় এডিনো ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
পরিচালক আরও জানান যে, এই 'রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট' তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা করানোর সুবিধা উপলব্ধ নেই।
"খুব খারাপ পরিস্থিতির শিশুরা হামের সঙ্গে এডিনো ভাইরাসেও আক্রান্ত। এ পর্যন্ত তাঁরা হামে আক্রান্ত ৩৫ শিশুর নমুনা পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে ১৬ শিশুর নমুনায় এডিনো ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।" এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক এক সভায় শিশু হাসপাতালের পরিচালকের পক্ষে উপস্থিত একজন অধ্যাপক উপস্থাপন করেন। সেই সভায় স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, হাম বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ (UNICEF) প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (icddr,b) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
চিকিৎসকদের মতে, ছয় মাসের কম বয়সী হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তাদের মধ্যে 'সাদা ফুসফুস' (White Lung) নামক একটি গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, যার অর্থ হলো ফুসফুস আর কার্যকরভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারছে না। দেশের সামগ্রিক হাম পরিস্থিতি যেখানে উদ্বেগজনক এবং প্রতিদিন হামে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, সেখানে এডিনো ভাইরাসের সহ-সংক্রমণের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মনোযোগ এবং কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তারা এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছে এবং কোনো গুরুত্ব দেয়নি।
অধ্যাপক মির্জা জিয়াউল ইসলাম Desi Media Point-কে আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে এবং তাদের একজন প্রতিনিধি শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।
তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ জুনের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সভায় উপস্থিত একজন হাম বিশেষজ্ঞ শিশু হাসপাতালের এই নতুন হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহ-সংক্রমণের তথ্যটি একটি সংক্রামক রোগবিষয়ক নেটওয়ার্কে প্রকাশ করেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি-আটলান্টা (CDC-Atlanta) বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত হয়।
সিডিসি-আটলান্টা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংক্রমণের ওপর নজরদারি করে থাকে। সংস্থাটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (IEDCR) সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করে। তারা দীর্ঘদিন ধরে icddr,b-এর সাথেও অংশীদারিত্ব বজায় রেখে চলেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে, সিডিসি-আটলান্টা ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সিডিসি কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে, যার ফলস্বরূপ সিডিসি কর্মকর্তারা শিশু হাসপাতাল পরিদর্শনে যান।
একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সিডিসি-আটলান্টা থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন তা বিশদভাবে জানতে আগ্রহী এবং শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে একটি ফলপ্রসূ আলোচনার প্রত্যাশা করছে।
এই সব ঘটনার পরেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম Desi Media Point-কে বলেন, "এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে শিশু হাসপাতাল থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য উঠে এসেছে। এমন একটি গুরুতর বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিছুই জানবে না বা কোনো পদক্ষেপ নেবে না, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মেনে নেওয়া কঠিন।"
একসময় ধারণা করা হতো যে, বাংলাদেশ থেকে হাম প্রায় নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে। তবে, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে। সরকার ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরবর্তীতে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ—এই চারটি সিটি কর্পোরেশনে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। অতঃপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হাম-রুবেলার টিকার একটি জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হয়, যা ২০ মে শেষ হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ প্রাথমিকভাবে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু জুন মাসে পরিচালিত ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের সময় জানা যায় যে, এই বয়সী শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখ। এর অর্থ হলো, ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে সরকার তার টিকাদান ক্যাম্পেইন সমাপ্ত করেছে।
গতকালও দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২২ জন রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করতে এসেছেন। একই দিনে হামের কারণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হামে মোট ৮৪৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার সর্বাধিক।
সাধারণত একটি টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার একটি প্রত্যাশা থাকে। জনস্বাস্থ্যবিদদের একাংশও গণমাধ্যমে এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তবে বাস্তবে এই চিত্র দেখা যায়নি। হাম কেন নিয়ন্ত্রণে আসেনি তা নিয়ে যখন বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই শিশু হাসপাতাল এডিনো ভাইরাসের এই সহ-সংক্রমণের বিষয়টি সামনে এনেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।