Thu 6th Aug 2026, 3:18 am

মেঘনায় বালু আগ্রাসন: ভোলায় বিলীন হচ্ছে চর ও জনপদ

মেঘনায় বালু আগ্রাসন: ভোলায় বিলীন হচ্ছে চর ও জনপদ
মেঘনা নদীতে অব্যাহতভাবে চরভূমি বিলীন হচ্ছে, যার মাত্র কয়েক গজ দূরে শতাধিক ড্রেজার ও বাল্কহেড দিয়ে চলছে বালু উত্তোলন। ভোলা সদর উপজেলার মেঘনাতীরবর্তী বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন যে, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে একদিকে যেমন নতুন জেগে ওঠা চর, বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, তেমনি পরিবেশগত বিপর্যয়ও ঘটছে।

গত সোমবার সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ভোলা ও লক্ষ্মীপুর জেলার সীমান্তসংলগ্ন মেঘনা নদীতে শতাধিক খননযন্ত্র ও বাল্কহেড ব্যবহার করে ব্যাপক হারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এই উত্তোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থলগুলি হলো ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের কালুপুর এবং দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের মধুপুর ও বৈরাগীর চর মৌজা। বৈরাগীর চর ও মধুপুর চরের অত্যন্ত কাছ থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পাড় ভেঙে দ্রুতগতিতে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র অনুযায়ী, ইউনিয়নের মোট আটটি মৌজার মধ্যে সাতটি মৌজার ৩,৭০৫ একর জমি ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকে বারাহিপুর ও রামদেবপুর মৌজায় ৮৮০ একরসহ প্রায় ১,০০০ একর নতুন ভূমি জেগে উঠলে ৫২০টি ভাঙনকবলিত পরিবারকে ঘর ও জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। তবে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে গত দুই বছরে এই দুটি মৌজাও প্রায় বিলীন হয়ে গেছে, বর্তমানে মাত্র ২০-২৫টি ঘর অবশিষ্ট রয়েছে। পাশাপাশি, পাশের মদনপুর ইউনিয়নের মধুপুর ও বৈরাগীর চর মৌজাও ভাঙনের শিকার হচ্ছে।

কাচিয়া মাঝের চরের বাসিন্দা তানজির আলম মাঝি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, 'বাড়িঘর ভাঙনের পর সরকার আমাদের মাঝের চরে পুনর্বাসন করেছিল, যেখানে আমরা ভালোই ছিলাম। কিন্তু সাম্প্রতিক ভাঙনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাকা ঘরগুলোও মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে আমি পাশের মধুপুর ইউনিয়নে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।' এই উক্তিটি বালু উত্তোলনের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের করুণ অবস্থার চিত্র তুলে ধরে।

ভোলার একজন স্বনামধন্য কৃষক আবুল হাসান, যিনি বৈরাগীর চরে শতাধিক একর জমিতে চাষাবাদ ও গবাদিপশু পালন করেন, জানান যে মেঘনার আগ্রাসী রূপ ভোলার মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে, বিগত কয়েক বছরের মানবসৃষ্ট ভাঙন প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তাঁর অভিযোগ, 'বালুখেকোদের নির্মম লোভের কারণে মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা রামদেবপুর, বারাহীপুর, মধুপুর ও বৈরাগীর চরগুলো বিলীন হচ্ছে। ৬০-৭০টি ড্রেজার ব্যবহার করে দিনরাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।' আবুল হাসান আরও উল্লেখ করেন যে এই বালু উত্তোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে চরাঞ্চল, ইলিশা লঞ্চঘাট, ফেরিঘাটের ব্লকবাঁধ, রাজাপুর ও শিবপুরের জমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।

৬৫০টি মহিষের বাথানের মালিক আবুল কাশেম জানান, 'ভোলা সদর এলাকার চরগুলোর অবস্থা শোচনীয়। দিনরাত নির্বিচারে বালু কাটার কারণে চরের জায়গাজমি, মহিষের ঘাস এবং বাথান সবকিছুই মেঘনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাতে ড্রেজার সরাসরি চরের পাশ থেকে এবং দিনে কিছুটা দূরে থেকে বালু উত্তোলন করছে।'

ভোলা জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, স্থানীয় জনগণের আপত্তি উপেক্ষা করে ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র মেঘনা নদীর ধনিয়া, ইলিশা ও কাচিয়া ইউনিয়নের জলসীমানায় বাংলা ১৪২৮ সন থেকে চারটি বালুমহাল ঘোষণা করা হয়। ২০১৯ সালে জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের জন্য প্রথম দরপত্র আহ্বান করে। চলতি বাংলা ১৪৩৩ সনে চারটি মহালের জন্য ইজারা ডাকলেও ৩ (কাচিয়া) ও ৪ নম্বর (দক্ষিণ গাজীপুর) বালুমহাল ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট দুটি মহালের জন্য উচ্চমূল্যের কারণে কোনো ইজারাদার অংশ নেয়নি।

ভোলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলেন, 'মেঘনা নদী থেকে ৭০-৮০টি ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সরকার যে পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বালু অল্প সময়ে তুলে ফেলা হচ্ছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধন, উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি প্রদান ও বিক্ষোভের মতো আন্দোলন পরিচালিত হলেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। বালু উত্তোলন বন্ধে জোরাল পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।' স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারাকৃত নির্ধারিত দুটি মহাল থেকে বালু না তুলে ইজারাদাররা নিজেদের সুবিধামতো অন্য জলসীমা থেকে বালু উত্তোলন করছেন।

৪ নম্বর বালুমহালের ইজারাদার এবং ভোলা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি জামিল হোসেনের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বালু উত্তোলন সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, যদিও লাইসেন্সটি তাঁর নামে, তবে ইজারাটি জেলা বিএনপি নিয়ন্ত্রণ করছে। জামিল আরও বলেন, 'শুনেছি ইলিশার শেষ প্রান্তে লক্ষ্মীপুর জেলা সীমানার দিকে অনুমোদিত সীমানার মধ্যেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ভোলার সীমানা এবং কাচিয়া মাঝের চরের ভাঙন রোধে বালু উত্তোলন বন্ধের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করব।'

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলীরা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবোর কয়েকজন সাবেক প্রকৌশলী জানিয়েছেন যে, উপকূল বা চরের অত্যন্ত কাছ থেকে বালু উত্তোলন করা হলে চরের ওপর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী। তাঁদের মতে, চরের পাশ থেকে বালু তুললে নদীর তলদেশ গভীর হয়ে যায়, যা পাড় ধসে পড়া ও মারাত্মক ভাঙনের কারণ হয়।