Fri 7th Aug 2026, 3:04 am

ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ে গবাদিপশুর প্রাধান্য: ফসলের চেয়ে বহুগুণ বেশি মুনাফা

ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ে গবাদিপশুর প্রাধান্য: ফসলের চেয়ে বহুগুণ বেশি মুনাফা
ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য আয়ের চিরায়ত উৎস শস্যভিত্তিক চাষাবাদ থেকে সরে এসে এখন গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনই প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এক জাতীয় জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র কৃষক বছরে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে যে গড় আয় করেন, তা ধান, সবজি বা অন্যান্য ক্ষণস্থায়ী ফসল থেকে অর্জিত আয়ের প্রায় ছয় গুণ।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রাক্তন মহাপরিচালক মো. শহজাহান কবীর Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন যে, কৃষকদের আয় এখনো অত্যন্ত নগণ্য। এই বাস্তবতার কারণে বহু ক্ষুদ্র কৃষক বাধ্য হচ্ছেন কৃষিকাজ পরিত্যাগ করতে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কৃষকদের এই শূন্যস্থান পূরণ করছে এক শ্রেণির বৃহৎ বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ী, যাদের কাছে কৃষি নিছকই জীবিকা নয়, বরং একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ। এর ফলস্বরূপ, ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ও কৃষিক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ‘ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রোডিউসার্স সার্ভে ২০২৫’ শিরোনামে এই জরিপটি পরিচালিত হয়। বিবিএসের টেকসই কৃষি পরিসংখ্যান প্রকল্প দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি কৃষি পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেছে। বিবিএস গতকাল মঙ্গলবার জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে।

এই জরিপে দেশের সকল কৃষকদের জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা এবং কৃষি থেকে বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উল্লিখিত তিনটি সূচকের মধ্যে যাঁরা সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কৃষি খাত থেকে কৃষকদের স্বল্প আয় একটি পুরনো এবং বহুল আলোচিত সমস্যা। ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপকতার কারণে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সম্প্রতি এক সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আলুচাষিদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে বলেন, টানা দুই বছর দেশে এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদিত হলেও চাষিরা উৎপাদন খরচের তুলনায় উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান অতিরিক্ত খরচ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য কৃষকদের আয় কমিয়ে দিচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণায়ও একই ধরনের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। গবেষণাটি দেখায় যে, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চালের গড় বিক্রয়মূল্য ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা হলেও, সেই একই চাল ব্যাপারী, মিলার ও আড়তদার হয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ, ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, কিন্তু এই বর্ধিত মূল্যের সিংহভাগ কৃষকের কাছে পৌঁছায় না।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর অর্ধেকেরও বেশি (৫৩.৬৫ শতাংশ) এই ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে ক্ষুদ্র কৃষকের গড় আয় আসে ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। এর বিপরীতে, ধান, সবজি ও অন্যান্য ক্ষণস্থায়ী ফসল থেকে গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা। ফলদ ও স্থায়ী ফসল থেকে আয় আরও কম—২ হাজার ৩৩১ টাকা। তবে বনজ সম্পদ থেকে আয় তুলনামূলকভাবে বেশি, যা ১০ হাজার ৮৯২ টাকা। মাছ চাষ থেকে প্রাপ্ত আয় ১২ হাজার ৬৭০ টাকা।

আয়ের ক্ষেত্রে বিভাগীয় পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের বার্ষিক গড় আয়ে রাজশাহী বিভাগ শীর্ষে, যেখানে গড় আয় ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ, যার গড় আয় ৪৪ হাজার ২৮ টাকা। এই দুটি বিভাগের গড় আয়ই জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সর্বনিম্ন গড় আয় দেখা গেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে একজন ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক আয় ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। যদিও জরিপে এই আঞ্চলিক বৈষম্যের সুনির্দিষ্ট কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে খুলনা অঞ্চলে হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উন্নত জাতের পশুপালনে আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা এবং কৃষি থেকে বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে যাঁরা শীর্ষ ৪০ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছেন, তাঁদের ‘বৃহৎ উৎপাদক’ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। একজন বৃহৎ উৎপাদকের বার্ষিক গড় আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা, যেখানে সকল কৃষকের সম্মিলিত গড় আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, কৃষকদের আয়ে পশুর জাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু থেকে বছরে গড় আয় আসে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ টাকা। জার্সি বা ব্রাহমা জাতের গরু থেকে গড় আয় হয় ২ লাখ ২ হাজার টাকা। এর বিপরীতে, দেশি গরু থেকে গড় আয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৮ টাকা। দেশি ছাগল থেকে বার্ষিক গড় আয় আরও কম, মাত্র ৪ হাজার ৯০২ টাকা।

মুরগি পালনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চিত্র পরিলক্ষিত হয়। সোনালি জাতের মুরগি থেকে বছরে গড় আয় ৩৬ হাজার ৬৩৩ টাকা, যেখানে ব্রয়লার থেকে আয় ২৫ হাজার ৮৫৯ টাকা। এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: উন্নত জাতের গবাদিপশু ক্রয়ের জন্য ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় মূলধন বা সহজ ঋণ সুবিধার কতটা সহজলভ্যতা রয়েছে? যাদের এই সামর্থ্য নেই, তাদের আয় তুলনামূলকভাবে কমই থাকছে।

নারীর শ্রম বিদ্যমান, কিন্তু নেতৃত্বে ঘাটতি: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির পরিচর্যা এবং দুধ দোহনের মতো কাজে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই শ্রমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারগুলোর মাত্র ১০.৭ শতাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী।