Tue 25th Aug 2026, 5:17 am

গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত টাইলস উৎপাদন: বাজারজুড়ে তীব্র পণ্যের ঘাটতি

গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত টাইলস উৎপাদন: বাজারজুড়ে তীব্র পণ্যের ঘাটতি
গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গ্রেটওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের টাইলস উৎপাদন ইউনিটটি গ্যাস সংকটের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। এই অচলাবস্থার ফলে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন ৪০ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদনের ক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলস্বরূপ, কর্তৃপক্ষ কারখানার অধিকাংশ শ্রমিককে সাময়িক ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের হবিগঞ্জে অবস্থিত স্যানিটারিওয়্যার কারখানাতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে, যেখানে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই কারখানায় মাসিক ১ লক্ষ পিস কমোড, বেসিনসহ অন্যান্য স্যানিটারি পণ্য উৎপাদিত হয়।

গ্রেটওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ ইকবাল মাহমুদ Desi Media Point-কে জানান, "সাধারণত আমাদের কাছে দেড় মাসের টাইলসের মজুদ থাকে। প্রায় এক মাস যাবৎ তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, আমরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী টাইলস সরবরাহ করতে পারছি না, যার ফলে ইতোমধ্যেই বিক্রয় কমেছে।" তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিক্রয় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রায় এক মাস ধরে চলা গ্যাস সংকটে গ্রেটওয়াল সিরামিকের মতো সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও, সিরামিক শিল্পের অন্যান্য বেশ কয়েকটি কারখানাতেও উৎপাদন আংশিকভাবে চালু আছে। তবে, এই খাতের বেশিরভাগ কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ২০-৩০ শতাংশে চলছে, যা বাজারে টাইলসের সরবরাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

সিরামিক খাতের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় কারখানাগুলোর সমস্ত উৎপাদন ইউনিট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলস্বরূপ, বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছে। তারা সতর্ক করেছেন যে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এই কারখানাগুলো মারাত্মক আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হবে এবং দেশীয় পণ্যের ঘাটতি পূরণে আমদানি বৃদ্ধি পেতে পারে।

দেশের শিল্প খাত প্রায় এক মাস ধরে তীব্র গ্যাস সংকটে জর্জরিত, যার মূল কারণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহকারী এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দুর্ঘটনা। গত ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও, সংকট পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। তিন দিন সরবরাহ কমার পর গত বুধবার দুপুর তিনটায় কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। যদিও গত শনিবার এক্সিলারেট টার্মিনাল আবারও আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৭৬টি কারখানা তৈজসপত্র, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার এবং সিরামিক ইট উৎপাদন করে, যার মধ্যে ৩১টি টাইলস কারখানা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টাইলসের স্থানীয় বাজারের মূল্যমান ছিল ৫ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা, যার ৮২ শতাংশ দেশীয় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

সিরামিক কারখানাগুলো প্রধানত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং ভোলায় অবস্থিত। তবে, ভোলা ও হবিগঞ্জের ৭-৮টি কারখানা ব্যতীত অন্যান্য অঞ্চলের প্রায় সমস্ত সিরামিক কারখানা গ্যাস সংকটে জর্জরিত।

বিসিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুল হাকিম মন্তব্য করেন, "সার্বিকভাবে সিরামিক খাতের উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে আমদানি বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদন হ্রাসের কারণে সিরামিক কারখানাগুলো রুগ্‌ণ শিল্পে পরিণত হচ্ছে।"

দেশের শীর্ষস্থানীয় টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকের চারটি ইউনিটের মধ্যে তিনটি গ্যাস সংকটের কারণে টানা আট দিন বন্ধ ছিল। গত শুক্রবার তাদের একটি ইউনিট চালু হলেও, সামগ্রিকভাবে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

আরএকে সিরামিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম Desi Media Point-কে বলেন, "আট দিন বন্ধ থাকার পর আমাদের একটি ইউনিট পুনরায় চালু হয়েছে। তবে, এই বন্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আমরা এখনও নিরূপণ করিনি।"

এদিকে, গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত মীর সিরামিকসের কারখানার চারটি ইউনিটের মধ্যে তিনটি ১৭ দিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে। দৈনিক ৩ লক্ষ বর্গফুট টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা সম্পন্ন এই কারখানায় বর্তমানে মাত্র ৫০ হাজার বর্গফুট টাইলস উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় কারখানার ৮০০ শ্রমিকের অধিকাংশই বর্তমানে ছুটিতে আছেন।

মীর সিরামিকসের একজন কর্মকর্তা, শহীদুজ্জামান Desi Media Point-কে জানান, "গ্যাসের অপর্যাপ্ত চাপের কারণে আমরা একটির বেশি ইউনিট চালাতে পারছি না। এর ফলে, বাজারে চাহিদা অনুযায়ী টাইলস সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা পণ্যের তীব্র সংকট সৃষ্টি করছে।"

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আষাঢ়িয়ারচরে অবস্থিত মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) সিরামিক কারখানায়ও গ্যাস সংকটের কারণে টাইলস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দৈনিক ৫১ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না।

এমজিআইয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) এ কে এম জিয়াউল ইসলাম বলেন, "গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে সমস্যা হলেও, আমাদের কিছু মজুদ পণ্য থাকার কারণে আপাতত চাহিদা পূরণে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না। তবে, এই মজুদ দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।"

সিরামিক খাতের শিল্পমালিকদের সংগঠন বিসিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল হাকিম সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে Desi Media Point-কে জানান, "সার্বিকভাবে সিরামিক খাতের উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি বাড়বে এবং উৎপাদন হ্রাসের কারণে কারখানাগুলো রুগ্‌ণ হয়ে পড়বে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের নীতিগত সহায়তা জরুরি।"

বিসিএমইএর সভাপতি মইনুল ইসলাম Desi Media Point-কে বলেন, "ভোলা ও হবিগঞ্জ ব্যতীত অন্যান্য অঞ্চলের সিরামিক কারখানাগুলোতে গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন হচ্ছে না, যার ফলস্বরূপ কারখানাগুলো আর্থিকভাবে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি এক বছরের জন্য স্থগিত রাখা এবং ছয় মাস কিস্তি পরিশোধ না করলে খেলাপি ঘোষণার নিয়ম বাতিল করা প্রয়োজন। এছাড়াও, ব্যাংকের বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ কমানোর অনুরোধ করা হবে। এই বিষয়গুলি আমরা শীঘ্রই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করব।"

মইনুল ইসলাম আরও জানান যে, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সাথে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রতিনিধিরা গতকাল গ্যাস সংকট এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যান্য সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সাক্ষাৎ করেছেন, যেখানে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী তাদের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা চেয়েছেন। এফবিসিসিআইয়ের সহায়ক কমিটির সাথে আলোচনার পর তারা এই পরিকল্পনা জমা দেবেন।