Thu 20th Aug 2026, 12:11 pm

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৬: আজ ভোট গ্রহণ, প্রক্রিয়া ও বিস্তারিত

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৬: আজ ভোট গ্রহণ, প্রক্রিয়া ও বিস্তারিত
সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হলেও, একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই ভোট চলবে, যেখানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

এই নির্বাচনে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন: ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং তাঁর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ। সংসদে বিএনপির সদস্য সংখ্যা ২৪৭ জন হওয়ায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। তবে, একাধিক প্রার্থী থাকায় নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী ভোট গ্রহণ অপরিহার্য।

১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই বছরই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর টানা সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এইবার, সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁদের ভোট প্রদান করছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন নয়; সংসদ সদস্যরা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে ব্যালটে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। চিফ হুইপ জানিয়েছেন যে, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করবেন।

গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৬ আগস্ট এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদের অধিবেশন বর্তমানে স্থগিত থাকায়, ভোট গ্রহণের উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্যদের একটি বিশেষ বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। এই বৈঠকে সিইসি সভাপতিত্ব করবেন এবং নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন নয়। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসেই ভোট দেবেন। প্রথমে তাঁরা ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে ব্যালট গ্রহণ করবেন। এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে পুনরায় পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন।

সংসদ সচিবালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল উভয়েই সংসদ সদস্য হিসেবে এই নির্বাচনের ভোটার। তাঁদের ভোট প্রদানের জন্য সংসদ কক্ষে পৃথক আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেহেতু একজন সংসদ সদস্য, তিনি নিজেও ভোট দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষিত হবে। অন্যদিকে, অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তিনি ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না।

গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান যে, ভোট গ্রহণের শুরুতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার এবং প্রধানমন্ত্রীর ভোটদান বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এরপর সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে এবং ভোট গণনার সময় পুনরায় সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে। গণনা শেষে নির্বাচনী কর্তা সংসদ কক্ষেই ফলাফল ঘোষণা করবেন এবং পরবর্তীতে গেজেট আকারে তা প্রকাশ করা হবে।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনসহ মোট ৩৫০টি আসন রয়েছে। তবে, আদালতের নির্দেশনায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল এখনো অমীমাংসিত থাকায়, বর্তমানে সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন।

ক্ষমতাসীন বিএনপির ২৪৭ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়াও, দলটির মিত্র বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।

অপরদিকে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০ জন। এই জোটের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন এবং জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচিত জাগপার একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়াও, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন এবং খেলাফত মজলিসের একজন সদস্য রয়েছেন।

এছাড়াও, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন। জানা গেছে যে, বিএনপি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছেও ভোট চেয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন।

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সেই সময়ে বিএনপি ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন লাভ করেছিল। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ওই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।

এরপরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলিতে বিরোধী দল থেকে আর কোনো প্রার্থী দেওয়া হয়নি, যার ফলে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। এবার বিরোধী জোটের প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর পুনরায় ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। ১৯৯১ সালের পর এইবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।