সার্বিয়ার রাজনীতিতে এখন এক নতুন অধ্যায়। পার্লামেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা আলেকজান্ডার ভুসিসের এক দশকের বেশি সময়ের শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা ক্ষমতায় থাকা ভুসিসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেছে। গত সেপ্টেম্বরে ভুসিস আকস্মিক আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এর প্রায় দুই বছর আগে থেকেই দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছিল। তবে আন্দোলনের তীব্রতা পায় ২০২৪ সালে নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর। এই দুর্ঘটনার জন্য ব্যাপকভাবে সরকারি দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বলকান অঞ্চলের এই দেশটিতে যদি ভুসিস পরাজিত হন, তবে তা এক বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। অনেকে এই পরিস্থিতিকে গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের নেতা ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। যদিও ভুসিস এখনও একজন শক্তিশালী প্রতিযোগী। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার অনেক সমর্থক মনে করেন, ভুসিসের নেতৃত্বেই সার্বিয়া অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং আধুনিকায়নের পথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের জ্যেষ্ঠ ইউরোপ বিশ্লেষক মারিও বিকারস্কি মন্তব্য করেছেন, 'ছাত্রদের এই প্যানেল ভুসিসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সার্বিয়ার এই নির্বাচন দেশটির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হতে পারে।' নির্বাচনী প্রচারে ভুসিস বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে পেনশন ও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি। তিনি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ এবং তরুণ দম্পতিদের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে, ভুসিস সার্বিয়ার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। একই সাথে, দেশটির ঐতিহ্যবাহী মিত্র ও প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের সম্ভাবনাও তিনি উন্মুক্ত রেখেছেন। তবে, তার শাসনামলে ইইউর সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিচার বিভাগ, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি দমনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে ইইউ ক্রমশ অসন্তুষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, 'স্টুডেন্ট লিস্ট' নামে পরিচিত ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হলো দুর্নীতি নির্মূল এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার তেমন কোনো বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এই আন্দোলনের প্রার্থী তালিকায় ২৫০ জন রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সাধারণ ভোটারদের কাছে অপরিচিত। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অভিনেতা এবং কৃষকেরাও অন্তর্ভুক্ত। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রখ্যাত হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানোভিচ। জনমত জরিপগুলো নির্বাচনে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইপসোসের এক জরিপে ভুসিসের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ৪৭ শতাংশ ভোট পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে, ছাত্রদের সমর্থিত প্যানেলের পক্ষে রয়েছে ৪০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন। তবে অন্য কয়েকটি জরিপে ছাত্র আন্দোলন এগিয়ে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নোভি সাদে রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর থেকে সার্বিয়ায় দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই দুর্ঘটনাই ছিল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মূল কারণ। গত বৃহস্পতিবার রাজধানী বেলগ্রেডের কেন্দ্রে ছাত্র আন্দোলনের প্রায় দেড় লাখ সমর্থক এক বিশাল সমাবেশ করেন। যদিও ভুসিস এবং তার দল দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারির অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ভুসিসের দাবি, ক্রোয়েশিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিদেশি এজেন্টরা এই ছাত্র আন্দোলনে অর্থায়ন করছে। অবশ্য শিক্ষার্থীরা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।