Sun 25th Oct 2026, 2:28 pm
|

মক্কা চুক্তির পর ‘বদর’: কৌশলগত জোটের নতুন দিগন্ত ও আঞ্চলিক প্রভাব

মক্কা চুক্তির পর ‘বদর’: কৌশলগত জোটের নতুন দিগন্ত ও আঞ্চলিক প্রভাব
দোহায় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকে একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ আখ্যা দিতে শুরু করেন। তবে এটি একটি ভুল চুক্তির জন্য সম্পূর্ণ ভুল একটি তকমা। গত বুধবার তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান এবং ইন্দোনেশিয়া যৌথ উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সামরিক প্রশিক্ষণের ওপর ‘বদর’ নামে একটি প্রতিরক্ষা শিল্প–বিষয়ক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইন্দোনেশিয়ার উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী এতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন। এই চুক্তিতে কোনো যৌথ সামরিক প্রতিরক্ষা বা পারস্পরিক সুরক্ষার ধারা নেই, যা এর মূল বৈশিষ্ট্য। এর বিপরীতে, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা’ চুক্তি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা জোট, যেখানে এক দেশের ওপর হামলা অন্যদের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হয়। ইয়েমেনের হুতিদের সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার পর চলতি মাসেই চুক্তিটি সক্রিয় করা হয়েছে। ‘বদর’ চুক্তি একেবারেই ভিন্ন একটি উদ্দেশ্যে কাজ করে। মক্কা চুক্তি দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক অবস্থান এবং কে কার পাশে দাঁড়াবে তা নির্ধারণ করে, আর বদর চুক্তি অনুসন্ধান করে—কে কী নির্মাণ করবে। ‘বদর’ নামটি হয়তো ঐতিহাসিক ও বিস্তৃত কোনো ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে। তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আরবি ‘বদর’ (পূর্ণচন্দ্র) শব্দটি এই চারটি দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে। এর ঐতিহাসিক নামটির সামরিক দ্যোতনা থাকলেও, চুক্তির মূল বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ শিল্পকেন্দ্রিক। তাই এটিকে কেবল রূপক বা কাব্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, এর অন্তর্ভুক্ত অনুচ্ছেদগুলোর ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। এই অনুচ্ছেদগুলো মূলত বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পকে একটি একক কাঠামোর অধীনে আনার বিষয়ে কথা বলে, এবং এই প্রকল্পগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। তুরস্ক ইস্তাম্বুলে দুটি বাবর-ক্লাস কর্ভেট তৈরি করে পাকিস্তানকে সরবরাহ করেছে এবং বাকি দুটি সম্পন্ন করার জন্য করাচি শিপইয়ার্ডকে আধুনিকায়ন করেছে। ইন্দোনেশিয়ার পিনদাদ-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাপলান এমটি ট্যাংক তৈরি করছে তুরস্ক। ‘বদর’ চুক্তিকে সরাসরি কোনো উন্মুক্ত জোট হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি, এবং এতে যোগদানের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়াও এখনো জানানো হয়নি। তবে সামরিক চুক্তির তুলনায় শিল্প-সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর সম্প্রসারণ সাধারণত সহজ হয়। তাই তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারকারী এবং ‘মক্কা’ চুক্তির সদস্য দেশগুলো, যারা নিজেদের শিল্পকে ‘বদর’ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে ইচ্ছুক, তাদের ওপর নজর রাখা জরুরি। কাতারে আসেলসান এবং বারজান হোল্ডিংস মিলে ‘বারক’ পরিচালনা করছে, যা স্থানীয়ভাবে অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করে। কাতারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত সপ্তাহে জানান যে একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা উৎপাদন হাব তৈরি হতে চলেছে। সমঝোতা স্মারকটিতে সহযোগী ও অংশীদার দেশগুলোর প্রয়োজন মেটানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা রপ্তানিসহ চারটি দেশের বাইরের বৃহত্তর লক্ষ্যের ইঙ্গিত দেয়। তবে এর গঠন কাঠামোর দিকে লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। এই প্রকল্পগুলোতে তুরস্ক একটি কেন্দ্রীয় ‘হাব’ বা কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করে, যেখানে অন্যান্য দেশগুলো চাকার ‘স্পোক’ বা আরার মতো সংযুক্ত। ‘বদর’ চুক্তির আসল উদ্ভাবন হলো এই স্পোকগুলোকে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। যদি পাকিস্তানি প্রকৌশল, কাতারি মূলধন এবং ইন্দোনেশিয়ান উৎপাদন খাত আঙ্কারাকে মধ্যস্থতাকারী না বানিয়ে সরাসরি একই প্রকল্পে কাজ শুরু করতে পারে, তবে ‘বদর’ এমন কিছু অর্জন করবে যা কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দিয়ে সম্ভব ছিল না। সময়টাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ, ২০২৫ সালে দোহায় ইসরায়েলি হামলা এবং চলতি বছরে ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে শিখিয়েছে যে শুধু অস্ত্র কেনার জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়া কতটা অনিরাপদ হতে পারে। মূল সামরিক সরঞ্জামের মতোই এর খুচরা যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার এবং রক্ষণাবেক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের অনুপস্থিতি কোনো অবহেলা বা দূরত্বের ফল নয়; কারণ আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সঙ্গে রিয়াদের প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা ইতিমধ্যেই ‘মক্কা’ চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। পাকিস্তান দুটি কাঠামোতেই রয়েছে—একটিতে নিরাপত্তা প্রদানকারী এবং অন্যটিতে শিল্প অংশীদার হিসেবে। এই দ্বৈত ভূমিকাটিই ‘বদর’ চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সত্য। পরবর্তী সময়ে কে এই জোটে যুক্ত হচ্ছে? সম্প্রসারণের বিষয়টি প্রথমত ‘মক্কা’ চুক্তির প্রশ্নের ওপর নির্ভর করে। মিশর সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী; বাংলাদেশ ও সিরিয়া সদস্যপদ বিবেচনায় থাকার কথা স্বীকার করেছে; আর বিশ্লেষকেরা কাতারকে এতে যুক্ত হওয়ার স্বাভাবিক দাবিদার হিসেবে দেখছেন। প্রতিবেশীরা এটিকে কীভাবে দেখছে? এই লেখার সময়ে ‘বদর’ চুক্তি নিয়ে ভারত বা ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ‘মক্কা’ চুক্তিতে তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়। নয়াদিল্লি জানিয়েছিল তারা চুক্তিটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তায় এর প্রভাব পরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে ভারতীয় বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে ভারত নিজের জায়গায় থেকেও সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তা ‘মক্কা’ চুক্তিকে ইসরায়েলবিরোধী জোট আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, মিশর এতে যোগ দিলে তা অবাক করার মতো কিছু হবে না। আশা করা যায় ‘বদর’ চুক্তিকেও একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হবে এবং সেই মূল্যায়নে বিষয়ের চেয়ে বাড়িয়ে দেখার প্রবণতাই বেশি থাকবে। প্রতিরক্ষা ধারা ছাড়া একটি সমঝোতা স্মারক কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির কাজ করতে পারে না। আসল পরীক্ষাগুলো অনেক শান্ত ও কঠিন। প্রথমত, ‘বদর’ কি এমন কোনো প্রকল্প তৈরি করতে পারবে, যেখানে অন্তত তিনটি সদস্যদেশ যুক্ত থাকবে? দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান, মেধাস্বত্ব এবং উৎপাদনের দায়িত্ব কি সমানভাবে ভাগ করা হবে, নাকি মূল চাবিকাঠি কেন্দ্রবিন্দুতেই থেকে যাবে? তৃতীয়ত, মূল উপব্যবস্থাগুলোতে পশ্চিমাদের লাইসেন্সিং সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে চুক্তিটি টিকে থাকতে পারবে কি না? প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির চেয়ে অনেক ধীরগতিতে এগোয়। পূর্ণ চাঁদ রাতের আকাশে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্যই আলো ছড়ায়। ‘বদর’ একটি দীর্ঘস্থায়ী শিল্প ভিত্তি হয়ে উঠবে নাকি ক্ষণস্থায়ী আলো হয়ে থাকবে, তা দোহার আনুষ্ঠানিক সভাঘরে নয়, বরং কারখানার মেঝেতে নির্ধারিত হবে।