Mon 24th Aug 2026, 5:08 am

গ্যাস-সংকটে ব্যাহত কাগজ উৎপাদন, লোডশেডিংয়ে গতিহীন ছাপাখানা

গ্যাস-সংকটে ব্যাহত কাগজ উৎপাদন, লোডশেডিংয়ে গতিহীন ছাপাখানা
আগামী শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো নিয়ে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব জটিলতার কারণে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট ও চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি এক শ্রেণির ছাপাখানা মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা করার লোভ ও নিয়ম লঙ্ঘনের প্রবণতা এই জটিলতাকে আরও ঘণীভূত করেছে।


বিভিন্ন ছাপখানা সূত্রে জানা গেছে, দেশে তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে কাগজ খাতের কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। কাগজ সংকটের পাশাপাশি চলমান লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে আগামী মার্চের আগে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রাক্প্রাথমিকের ৩০টি লটের জন্য ১১টি প্রেস পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেয়েছে। ইতিমধ্যে তারা বই ছাপানোর কাজ শুরু করেছে।  কিন্তু বই ছাপার কাজে কাগজের সংকট ও লোডশেডিং একটি অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


দুটি ছাপাখানার মালিক গতকাল Desi Media Pointকে জানিয়েছে, পাঠ্যবই যেসব প্রেসগুলোতে ছাপা হয়, তার বেশির ভাগ রাজধানীর বাইরে, গ্রামে অবস্থিত। ছাপাখানার বড় বড় মেশিন চালাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে প্রেসের কাজ সময়মতো এগুচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত ৭০ দিনে কাজ শেষ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


এর পাশাপাশি এক শ্রেণির ছাপাখানার মালিকরা পাঠ্যবই ছাপাতে নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তারা বই ছাপাতে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করছেন। এই অভিযোগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ইন্সপেকশন এজেন্ট দুটি ছাপাখানার ১৩২ টন নিম্নমানের কাগজ বাতিল করেছে। এর মধ্যে আনন্দ প্রিন্টার্সের ১১০ টন এবং অনুপম প্রিন্টার্সের ২২ টন কাগজ বাতিল হয়েছে।


বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু গতকাল Desi Media Pointকে জানান, বইয়ের মান নিশ্চিত করতে এবং নিম্নমানের কাগজ ও মুদ্রণ রোধে এনসিটিবি এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যারা অনিয়মে জড়িত হবে তাদের শোকজ নোটিশ দেওয়া হবে। পরপর তিন বার শোকজ নোটিশপ্রাপ্ত ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হবে।


এছাড়া, কাগজের অনুমোদন ছাড়াই এবার পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শুরু করেছে কয়েকটি ছাপাখানা, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নির্ধারিত প্রাইমারির ইন্সপেকশন এজেন্ট ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজিম মুনির গতকাল Desi Media Pointকে বলেন, ‘কাগজের মান ঠিক না থাকলে অনুমোদন দেওয়া হবে না। ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেডের সরবরাহ করা কাগজের উজ্জ্বলতা নির্ধারিত মানের চেয়ে কম। কাগজও বেশি মোটা। এ কারণে এই কোম্পানির কাগজও গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া, এবার ‘টিকে পেপার মিল’ ও ‘ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেড’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের কাগজের ওজন (জিএসএম) ও পুরুত্ব, কাগজের আলো প্রতিরোধক্ষমতা (অপাসিটি) ও কাগজের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা (বার্স্টিং ফ্যাক্টর) নিম্নমানের পাওয়া গেছে। যে কারণে এই কোম্পানির কাগজের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’ মো. সিরাজিম মুনির আরও জানান, নিম্নমানের কাগজের ব্যাপারে ছাপাখানা ও কাগজের মিল মালিকরা একে অন্যকে দোষারোপ করছেন। ছাপাখানার মালিকরা বলছেন, মিল মালিকরা নিম্নমানের কাগজ দিয়েছে। অন্যদিকে, কাগজের মিল মালিকরা বলেন, ছাপাখানার মালিকরা কম টাকায় নিম্নমানের কাগজ দিতে বলেছিলেন।


এনসিটিবি জানায়, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের জন্য এবার উজ্জ্বলতা (ব্রাইটনেস) ৮৫ শতাংশ, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ১৮ এবং অপাসিটি ৮৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাক্প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে ব্রাইটনেস ৮৫ শতাংশ, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ২০ ও অপাসিটি ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩০ কোটি ৬১ লাখ বই ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহে আহ্বান করা ৫৯৬টি লটের মধ্যে প্রায় ৬০টিতেই মাত্র একটি করে প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিয়েছে। এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, বড় কাজের প্রায় ৯০ শতাংশই ৮ থেকে ১০টি ছাপাখানার মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি কয়েকটি লটে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে বেশি দর প্রস্তাবের তথ্যও মিলেছে। এতে সরকারি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও সামনে আসছে। দেশে ছোটবড় সহস্রাধিক ছাপাখানা থাকলেও সরকারি বই ছাপার কাজে প্রতিযোগিতা নেই বললেই চলে। কম প্রতিযোগিতায় বাড়ছে সরকারি ব্যয়ের ঝুঁকি।


গত বছর অনিয়মে অভিযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এবার আবার দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের ত্রুটি এবং সময়মতো বই সরবরাহ করতে না পারার অভিযোগে এক বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল সাতটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে। পরে তাদের আবেদনের পর বোর্ডের সিদ্ধান্তে মুচলেকার ভিত্তিতে কালো তালিকা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানও ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কালো তালিকা থেকে অব্যাহতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নাহার প্রিন্টার্স, আমাজন প্রিন্টিং প্রেস, বর্ণমালা প্রেস, পিবিএস প্রিন্টার্স, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস, হাক্কানী প্রিন্টার্স ও সোহাগী প্রিন্টার্স। একটি ছাপাখানার মালিক বলেন, ‘আমাদের মতো মাঝারি ও ছোট ছাপাখানার সক্ষমতা থাকলেও বড় কাজের টেন্ডারে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করা কঠিন। ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগই সীমিত হয়ে যায়।’


অন্যদিকে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ের ই-টেন্ডার নিয়েও রয়েছে আলাদা অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রথমে প্রতি ফর্মার কস্ট এস্টিমেট ৩ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও টেন্ডার লাইভ থাকা অবস্থায় তা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়। প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা বাড়ার ফলে বিপুল সংখ্যক ফর্মার হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক শ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, কস্ট এস্টিমেট দেখার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। টেন্ডার লাইভ হওয়ার পর তারা বুঝতে পারে টাকার পরিমাণ কম ধরা হয়েছে। তাই চেয়ারম্যানের নির্দেশে পরবর্তী সময়ে টাকার পরিমাণ আরও ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়।