Mon 24th Aug 2026, 5:07 am

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির: ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন ও সাংবিধানিক জটিলতা

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির: ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন ও সাংবিধানিক জটিলতা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে গত শুক্রবার শপথ গ্রহণ করেছেন হুমায়ুন কবির, যিনি এর পূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায়) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিলেটে জন্মগ্রহণ করলেও মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান হুমায়ুন কবির। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন এবং উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। একপর্যায়ে তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জন করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে যে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্বভার গ্রহণের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি হুমায়ুন কবির তাঁর সাধারণ (সবুজ) পাসপোর্ট জমা দেন। একই মাসে তিনি সরকারি বা কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট গ্রহণ করেন এবং ওই মাসেই প্রথমবার এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরব সফর করেন। গত ছয় মাসে তিনি সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস, ফিলিপাইনসহ কমপক্ষে ১১টি বিদেশ সফর সম্পন্ন করেছেন। যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন যে, হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিক। তবে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আগে তিনি এই নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ (রিনাউন্স) করেছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। উল্লেখ্য, জন্মসূত্রে অন্য দেশের নাগরিকেরা পরে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব লাভ করলে জন্মগত দেশ এবং যুক্তরাজ্য — উভয় দেশের পাসপোর্টই রাখতে পারেন।

বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও নিশ্চিত করেছে যে, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য কোনো আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন — এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে জানতে চেয়ে গত শনিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া মেলেনি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ ধারায় মন্ত্রীদের নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, 'প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, তাঁহাদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ-সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।' এই বিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্য নন, এমন 'অনধিক এক-দশমাংশ' ব্যক্তি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হতে পারেন, তবে তাঁদের অবশ্যই 'সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য' হতে হবে। সংবিধানের ৬৬ ধারার ২(গ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, 'কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।'

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের একাধিক নজির রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশি নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করে মোট ২৩ জন প্রার্থী সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা ছিলেন। নির্বাচন কমিশন সেইসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিল যাঁরা নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের প্রমাণ দেখাতে পেরেছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া Desi Media Point-কে বলেন, 'হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না অথবা ত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন কি না, তা জাতি জানে না।' তিনি আরও বলেন, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদেশি আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়; কেবল আবেদন করলেই নাগরিকত্ব ত্যাগ হয়ে যায় না। ওই দেশ আবেদন যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে। জাতিকে এসব বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে অবহিত না করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় হুমায়ুন কবিরের প্রতিমন্ত্রী পদ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনের আগেও বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যেমন, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব থাকার কারণে বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা) আসনে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনীত প্রার্থী ও দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল। একই নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম হকের নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের সপক্ষে নির্বাচন কমিশনে নথি জমা দিয়েছিলেন, যদিও সেসব নথি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ভোটের লড়াইয়ে ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, সাংবিধানিকভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে বাংলাদেশে কারও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয় না, বরং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সম্পন্ন হয়।

হুমায়ুন কবিরের জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার হবসপুর গ্রামে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ এবং লিডস ল স্কুল থেকে পৃথক তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি লন্ডনে মেয়রের দপ্তরসহ ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি হয় ব্রিটেনে লেবার পার্টির রাজনীতির মধ্য দিয়ে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদ চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হুমায়ুন কবির লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হন।